সৌগত ভট্টাচার্য
পুজোর পর আসুন। পুজোটা যাক। পুজোর পর আলোচনা হবে।…
চায়ের দোকানে, অফিসে, বাজারে, ফোনের ওপারে, পাড়ার আড্ডায় কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায় পুজো আসছে। তিস্তার ধারে কাশফুল ফুটেছে কি না, সে খবর তখন আর আলাদা করে নিতে হয় না। জলপাইগুড়ির আকাশই বদলে যায়। বর্ষার ধূসর মেঘ একটু একটু করে সরে। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভাসে। জুবিলি পার্কের সামনে তিস্তার জল তখন খুব বেশি নয়। ক্ষীণ স্রোত। তার মধ্যে দু’একটি নৌকো। নৌকোর ছইয়ে রঙিন কাপড়টা নতুন।
একটু দূরে সাদা কাশফুল হাওয়ায় দোলে। জলপাইগুড়ির নিজস্বী তোলার মরশুমি জায়গা। সেই ছবি মোবাইল বাহিত হয়ে চলে যায় অনেক দূরে। শহরের বাইরে থাকা কেউ যে ছবি দেখে চুপ করে থাকেন। ছবিতে যে তাঁর তিস্তা আছে। তাঁর শহর আছে। নেই শুধু তিনি। বাড়ি ফিরতে না পারার কষ্ট চিনচিন করে। ক্যালেন্ডারে বর্ষা শেষ। আকাশও সেকথা মানতে শুরু করেছে।
ক্যালেন্ডারে আশ্বিন মাসটায় কালো কালো তারিখের মধ্যে হঠাৎ কয়েকটি লাল দিন। ছুটির দিন। পুজোর দিন। অপেক্ষার দিন। বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির নাটমন্দিরের পাশে পুরোনো পুকুরের কালচে জলে লাল শালুক। দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে গন্ধের মাঝে প্রতিমার কাঠামোয় মাটির প্রলেপ পড়ছে। হঠাৎ মনে হয়, তিনি এখানেই ছিলেন। শুধু আমাদের চোখে পড়েননি। আশ্বিন মাস জানে, অপেক্ষাও সুন্দর হতে পারে।
রাত পোহালে মহালয়ার ভোর। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই কণ্ঠ… জাগো তুমি জাগো…। জলপাইগুড়ি মহালয়ায় শুধু মহিষাসুরমর্দিনী শোনে না। সেই কালচারই নেই। সবাই বেরিয়ে পড়েন। কেউ রাজবাড়ির দিকে। কেউ তিস্তার দিকে। কারও গন্তব্য করলার পাড়। কারও আবার গন্তব্য নেই। শুধু হাঁটেন। অনেকে নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। কথা বলেন না। মনে হয়, দাঁড়িয়ে থাকাটাই প্রার্থনা। অনেক অপেক্ষার পর মহালয়ার ভোর জলপাইগুড়ির নিজস্ব উৎসব হয়ে ওঠে। যে উৎসবকে বোঝার জন্য মণ্ডপে না গেলেও চলে।
নদীর পাড়, রাজবাড়ির পুকুরের লাল শালুকে, তিস্তার চরের কাশবনজুড়ে পুজো পুজো গন্ধ তখন। বিসর্জনের পরেও ব্যতিক্রমী জলপাইগুড়ি। কদমতলা সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির লোকেরা গলা মেলান বন্দনা গীতিতে… ‘বিশ্ব জননী মাতা সুরধুনি, সকল সংকটে মুক্তিদায়িনী…।’ আট থেকে আশি সবাই। ধার্মিক-নাস্তিকের ফারাক নেই। ধনী-গরিবের ভেদ নেই। প্রথম স্তবক শেষ হতেই হইহই করে ওঠে রাস্তা। হাত ওঠে। কেউ নাচেন। কেউ চিৎকার করেন। তারপর হঠাৎ সব চুপ। রাজপথে সেই নৈঃশব্দ ভেঙে আবার ভেসে আসে- ‘জয় ভাগীরথী মকর বাহিনী…।’
পুজোতে কত যে ছোট ছোট গল্প। পাড়ায় পাড়ায় প্রেম জমে। কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করেন। বারবার ফোন দেখেন। ধুর ছাই, ফোনটা বাজছেই না। হয়তো অন্য প্রান্তের মানুষটিও অপেক্ষা করছেন। রাত বাড়লেও মানুষ হাঁটে। ফুচকা খাওয়ার পাশাপাশি তখনও প্রেম চলে। বন্ধুদের সঙ্গে খুনশুটি। শহরের বাইরে থেকে আসা ছোট্ট মেয়েটি এত আলো, এত শব্দের মধ্যে বাবার কাঁধে ঘুমিয়ে পড়ে। বাবা একহাতে মেয়েকে ধরে রাখেন। এর জন্যও বছরভর অপেক্ষা।
মণ্ডপ বদলে যায়। আলোর ধরন বদলে যায়। খাবারের দোকান বদলে যায়। মোবাইল বদলে যায়। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য একই থেকে যায়। যেমন নতুন জুতোর ফোসকা। অষ্টমীর সকালে শাড়ি পরা কিশোরীর মুখে ঘাম মেশানো মেকআপ। প্রথম প্রেমের লজ্জা। হাত থেকে ছুটে যাওয়া লাল গ্যাস বেলুন। বেলুনটা আকাশে উঠে যায়। এই দৃশ্যের জন্যও প্রতিবারের অপেক্ষা।
সবশেষে বিজয়ায় কোথাও ঢাকের তালে এক তরুণ নাচছেন। প্রেমিকা অনেকদিন তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। হঠাৎ ফোনে মেসেজ- ‘শুভ বিজয়া।’ সেই মুহূর্তে বিসর্জনের ঢাকের বাজনা আর তাঁর কাছে বিদায়ের শব্দ থাকে না। ঢাকের আওয়াজে পুরোনো প্রেমের দরজা খুলে যায়। ‘আবার কবে বছর পরে…।’ কথাটা সাধারণ। কিন্তু একথার ভিতরেই যেন মানুষের বেঁচে থাকা। একদিন সত্যিই পুজো শেষ হয়। করলার জল আবার নিজের মতো বয়ে যায়। তিস্তার জলও। জুবিলি পার্কে আবার আগের মতো বিকেল নামে। শরৎ চলে গেলে হেমন্ত আসে। তিস্তা-করলার জলে শরতের শেষ আলো পড়ে। পরের পুজোর দিন গোনা শুরু হয়। কিছু অপেক্ষা শেষ হয় না! কিছু অপেক্ষা আবহমান!

