উত্তরবঙ্গের বহু স্কুলে হস্টেল হারিয়েছে প্রয়োজন, কিন্তু তার স্মৃতি হারায়নি এখনও।
সুমন্ত বাগচী
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পরিচালনার সূত্রে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হচ্ছে। চোখে পড়ছে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন। স্কুল আছে, ছাত্রছাত্রী আছে, কিন্তু ছাত্রাবাস যেন ক্রমশই অদৃশ্য। অপেক্ষাকৃত নবীন স্কুলে তো হস্টেল থাকার প্রশ্নই কম। শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্রাবাস বহু বছর আগে বন্ধ হয়েছে। শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুলের আবাসিক ব্যবস্থার স্মৃতিও এখন অনেকটাই অতীত। জ্যোৎস্নাময়ী গার্লস হাইস্কুলের বড় ছাত্রীনিবাসের কথাও আজকাল কম শোনা যায়। মহানন্দার ওপারে মার্গারেট স্কুলকে ঘিরে যে আবাসিক জীবন একসময় ছিল, সেটিও এখন প্রায় স্মৃতির অংশ। অর্থাৎ একসময় বিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে যে ছাত্রাবাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল, উত্তরবঙ্গের বহু শহরেই তার উপস্থিতি এখন ক্রমশই ক্ষীণ।
জলপাইগুড়ি শহরের সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাস অবশ্য এখনও রয়েছে। তবে আগের দিনের সেই ব্যস্ততা নেই। প্রাক্তনীদের স্মৃতিতে এই হস্টেলের একটি দীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে। ডিবিসি রোডের নুর মঞ্জিল অট্টালিকায় একসময় শুরু হয়েছিল এর পথ চলা। পরে সেটি স্কুল প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হয়। কোচবিহারের জেনকিন্স স্কুলের ক্ষেত্রেও হস্টেল ক্যাম্পাসের অস্তিত্ব এখনও সরকারি নথিতে রয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্তে পুরোনো ছাত্রাবাসগুলির দিকে তাকালে বোঝা যায়, আবাসিক শিক্ষার প্রয়োজন আগের জায়গায় নেই। কোনওটি কার্যত ব্যবহারহীন, কোনওটির ব্যবহার সীমিত, কোনওটির স্মৃতি টিকে আছে শুধু পুরোনো ছাত্রছাত্রীদের কথায়। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক, ছাত্রাবাস কি তবে শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়েই যাচ্ছে?
আসলে বদলে গিয়েছে প্রয়োজনের মানচিত্র। পঁয়ত্রিশ–চল্লিশ বছর আগে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রাম, জঙ্গলঘেরা এলাকা কিংবা চা বাগানের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কাছে শহরের স্কুল ছিল পরবর্তী শিক্ষার প্রধান ভরসা। প্রাথমিকের পরে আরও পড়তে গেলে শহরে আসতে হত, আর আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকার সুযোগ ছিল হাতেগোনা। ফলে স্কুলের হস্টেল শুধু থাকার জায়গা ছিল না, শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ারও একটি ব্যবস্থা ছিল। গত তিন–চার দশকে গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য নতুন স্কুল গড়ে উঠেছে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েদের অনেকেই এখন বাড়ির কাছেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। যাতায়াতও আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। সেই কারণেই স্কুল হস্টেলের প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। সব ক্ষেত্রে নয়, কিন্তু প্রবণতাটি স্পষ্ট। সেই অর্থে পুরোনো অনেক ছাত্রাবাসের গুরুত্ব কমে যাওয়া কেবল অবহেলার গল্প নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি।
তবে আবাসিক শিক্ষার প্রয়োজন একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। বরং উচ্চশিক্ষায় তার প্রয়োজন এখনও যথেষ্ট। শিলিগুড়ি কলেজের ২০২৬ সালের নোটিশগুলিতে মহিলা হস্টেলে ভর্তি এবং একাধিক নির্বাচিত তালিকা প্রকাশের তথ্যই তার প্রমাণ। অর্থাৎ কলেজ স্তরে দূরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য আবাসনের প্রয়োজন এখনও প্রবল। বিদ্যালয় স্তরে যেখানে কাছের স্কুল সেই শূন্যস্থান অনেকটাই পূরণ করেছে, কলেজে সেই সুযোগ সবসময় নেই। বিশেষত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান এখনও তুলনামূলকভাবে কম এবং নানা জেলা থেকে ছাত্রছাত্রী আসে। ফলে স্কুল হস্টেল কমলেও কলেজ হস্টেলের প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষার বিস্তার তাই আবাসিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সরিয়ে দেয়নি, বরং তার প্রয়োজনের জায়গাটা বদলে দিয়েছে। একসময় হস্টেল ছিল স্কুলে পৌঁছানোর সেতু, এখন অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর অবলম্বন।
তবু নস্টালজিয়া তো যুক্তির হিসাব বোঝে না। পুরোনো ডর্মিটরি, লম্বা বারান্দা, একসঙ্গে খাওয়া, পড়া, খেলাধুলো আর রাত জাগার গল্প মনে পড়লেই মনে হয়, কোথায় গেল সেই হস্টেলগুলো? উত্তরবঙ্গের বহু পরিবারে সেই স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে। একসময় যে ছাত্রাবাস দূরের মেধাবী ছেলেমেয়েকে শহরে এনে পড়ার সুযোগ করে দিত, আজ তার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কৈশোর, বন্ধুত্ব, আত্মনির্ভরতা আর স্বপ্নের গল্প তো মুছে যায়নি। সময় বদলেছে, শিক্ষার মানচিত্র বদলেছে, বদলেছে ছাত্রাবাসের প্রয়োজনও। তবু পুরোনো হস্টেলের বন্ধ দরজার দিকে তাকালে মনে হয়, শুধু একটি ভবন নয়, উত্তরবঙ্গের শিক্ষাজীবনের একটি সময়ও যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

