মালদা: ঘড়ির কাঁটা তখন সাতটা ছুঁইছুঁই। সাহাপুর ঘাটে একে একে জড়ো হচ্ছেন সন্ধ্যা, কল্পনা, মালতীরা। কারও হাতে টিফিনের ব্যাগ, কারও হাতে বাজারের থলি। সকলের গন্তব্য মালদা (Malda) শহরের বিভিন্ন আবাসন ও গৃহস্থের বাড়ি। সেখানেই দিনভর কাজ করে নিজেদের সংসারের হাল ধরেন ওঁরা। প্রত্যেকে বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা মহানন্দা (Mahananda) দিয়ে বিপজ্জনকভাবে পারাপার করেন। নেই কোনও লাইফজ্যাকেটের সুবিধা। পেটের দায়ে বিপদ মাথায় নিয়ে প্রতিদিন নদী পার হতে হয়। শীত বা গ্রীষ্মে মহানন্দা প্রায় শুকিয়ে গেলেও বর্ষা এলেই নদীর চেহারা বদলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা ছাড়া যাত্রী পারাপারে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলে ডুবে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।
নৌকায় বসেই কথা হচ্ছিল সাহাপুরের বাসিন্দা কল্পনা মণ্ডলের সঙ্গে। মুখে হাসি থাকলেও চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ। বললেন, ‘ভয় তো লাগেই। কিন্তু এতদিন ধরে যাতায়াত করতে করতে এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। লাইফজ্যাকেট কোনওদিনই পাই না। কোনও কোনও নৌকায় একটা টিউব থাকে, কিন্তু একটা টিউব দিয়ে এতজনের কী হবে?’ বর্ষায় রাক্ষুসে মহানন্দা পার করতে ভয় হয় বলে শিকার করলেন সন্ধ্যা বর্মনও। হতাশ সুরে বললেন, ‘কিছু করার নেই। পেটের দায়ে তো কাজ করতে যেতেই হবে।’ মালতী পালের আতঙ্ক, ‘কোনওভাবে নৌকা উলটে গেলে কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন নদীতে যেমন ভয়াবহ স্রোত, তেমনই গভীরতা।’
সোমবার সেচ দপ্তরের সামনে মহানন্দা নদীর ঘাটে দেখা গেল মাঝি রতন হালদার যাত্রী তুলছেন নৌকায়। স্থানীয়দের দাবি, এই ঘাটে তিনিই একমাত্র নিয়মিত নৌকা চালান। গৃহ পরিচারিকাদের কাছ থেকে যাতায়াত বাবদ পাঁচ টাকা নেওয়া হয়। অন্য যাত্রীদের ক্ষেত্রে তা ১০ টাকা। নৌকায় লাইফজ্যাকেট নেই কেন? প্রশ্নের জবাবে রতন বলেন, ‘এবার পুলিশের তরফে লাইফজ্যাকেট দেওয়া হয়নি। দুটো টিউব দেওয়া হয়েছিল। একটা নৌকায় আছে, আরেকটা বাড়িতে রেখে এসেছি। নিয়ে আসতে ভুলে গিয়েছি।’ বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা শুরু হলেই নদীতে ঝুঁকি বাড়ে। অথচ যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতিতে কোনও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। প্রতিদিন বহু মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হন। তাঁদের কথায়, বিকল্প সেতু বা নিরাপদভাবে পারাপারের ব্যবস্থা না থাকাতেই সমস্যা।
প্রশাসনের কাছে যাত্রীদের আবেদন, নিয়মিত নৌকা পরিদর্শন, পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেটের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে কার্যকর করা হোক। এপ্রসঙ্গে ইংরেজবাজারের বিধায়ক অম্লান ভাদুড়ির মন্তব্য, ‘মালদা শহরের মধ্যেই নদীর উপরে তিন তিনটি সেতু তৈরি হয়ে যাওয়ায় মাঝিদের রুটিরুজিতে টান পড়েছে। অনেকেই এখন সেই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। তবুও আমি দাবি করছি, যাত্রীদের নিরাপত্তা স্বার্থে প্রশাসন এবং পুরসভা যৌথভাবে বিষয়টির ওপর নজরদারি চালাক।’

