কল্লোল মজুমদার, মালদা: মালদা (Malda) শহর থেকে দূরত্ব খুব বেশি হলে ২৮ কিলোমিটার। মানিকচকের বন্যাপ্রবণ এলাকায় ঢোকার মুখেই চণ্ডীপুর (Chandipur)। রাস্তার দু’পাশে এখন জনবসতি, চাষের জমি। কিন্তু এই পথ ধরে চলার পথে চোখ আটকে যায় একটি ভাঙাচোরা কংক্রিটের সেতুর দিকে। সময়ের স্রোতে সেতুটি আজ কার্যত পরিত্যক্ত। অথচ স্থানীয় মানুষের কাছে তা শুধুমাত্র একটি ভাঙা সেতু নয়, ভয়ংকর বন্যার এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন। প্রায় তিন দশক পরেও যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আতঙ্ক, বিচ্ছিন্নতা আর দুর্যোগের নানা গল্প।
ভাঙা সেতুর কাছেই সোমবার পাট শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন এলাকার প্রবীণ কৃষক মহম্মদ সাহিরুদ্দিন। পুরোনো দিনের কথা উঠতেই যেন তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল তিন দশক আগের সেই ভয়ংকর ছবি। স্মৃতির সিন্দুক খুলে তিনি বললেন, ‘১৯৯৬ সালের বন্যার কথা ভুলতে পারি? সম্ভবত সেপ্টেম্বরের একেবারে প্রথম সপ্তাহ। একদিন বিকেলে হঠাৎ হুড়মুড় করে এই সেতুর মাঝের অংশ বসে যায়। গাড়ি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মালদা শহরের সঙ্গে মানিকচকের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।’ ওই সময়ের কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন এলাকার প্রবীণ মহিলা জ্যোৎস্না বিবি। তাঁর কথায়, ‘১৯৯৬ সালের বন্যায় সেতুর মাঝের অংশটা পুরোপুরি বসে গিয়েছিল। ঠিক তার দু’বছর পর ১৯৯৮-এর বন্যায় সেতুর দু’দিকও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তারপর থেকে বছরের পর বছর এভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সেতুটি। প্রায় তিন দশক হল। কিন্তু এখনও সেদিনের কথা মনে পড়লে বুক কাঁপে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ১৯৯৬ সালের বন্যায় চণ্ডীপুর সেতু দিয়ে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর হয় সেনাবাহিনী। দ্রুত তৈরি করা হয় একটি বেইলি ব্রিজ। সেই অস্থায়ী সেতুর ওপর দিয়েই কিছুদিন চলাচল অব্যাহত ছিল। প্রায় বছরখানেক পর তৈরি হয় নতুন রাস্তা। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে মানিকচকের সঙ্গে মালদা শহরের যোগাযোগ। কিন্তু পুরোনো সেতুটি আর ফিরে পায়নি তার আগের চেহারা। বরং ১৯৯৮ সালের বন্যার জল ও স্রোতে ক্ষত আরও গভীর হয়। সেতুর দু’দিকের অংশ ভেঙে যায়। সময়ের সঙ্গে রাস্তা বদলেছে, যোগাযোগের ব্যবস্থা বদলেছে, নতুন প্রজন্ম এসেছে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা সেতুর ভাঙা কাঠামোটি এখনও অতীতের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
মানিকচকের (Manikchak) বাসিন্দা দেবজ্যোতি সিনহা বলেন, ‘যতবার এই রাস্তা দিয়ে যাই, ততবারই চণ্ডীপুর সেতু দেখে সেই ভয়ংকর বন্যার কথা মনে পড়ে যায়। ১৯৯৮ সালে সেতুটি পুরোপুরি ভেঙে গিয়ে মালদা শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।’ চণ্ডীপুরের এই ভাঙা সেতু তাই এখন আর নিছক একটি পরিত্যক্ত নির্মাণ নয়। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে সেতুটি ভয়ংকর বন্যার প্রতীক। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেতুর ভাঙা কংক্রিটের গায়ে যেন আটকে রয়েছে সেই সময়ের জল, মানুষের উৎকণ্ঠা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আতঙ্ক আর বাঁচার লড়াই। নতুন রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যানবাহন ছুটে চলে। তার পাশেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে পুরোনো সেতুটি—একটি প্রজন্মের কাছে ১৯৯৬ ও ১৯৯৮-এর বন্যার জীবন্ত স্মারক হয়ে।

