সুবীর মহন্ত ও রাজু হালদার, বালুরঘাট ও গঙ্গারামপুর: তৃণমূলের (TMC) রাজ্য সভাপতি বিপ্লব মিত্রের মুখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের প্রশংসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিপ্লব-সুকান্তকে একযোগে আক্রমণ শানালেন গঙ্গারামপুরের বিজেপি (BJP) বিধায়ক সত্যেন্দ্রনাথ রায়। এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, শাসক ও বিরোধী শিবিরের কিছু নেতা গোপনে ‘সমঝোতা’ করে রাজনীতি করছেন। সত্যেনের এহেন মন্তব্য দক্ষিণ দিনাজপুরের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তৃণমূলে থাকার সময়ই বিপ্লবের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন সত্যেন। যার জেরে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে একইদিনে বিজেপিতে যোগ দেন। যথারীতি ২০২১-এর পর ’২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলের জেলা স্তরের নেতাদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ছে। গঙ্গারামপুরে মেডিকেল কলেজ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ করতে না পারা, মন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা থাকলেও শেষপর্যন্ত তা না হওয়া, গঙ্গারামপুর কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি পদ থেকে তাঁর নাম বাদ যাওয়া—এমন নানা ঘটনায় ক্ষুব্ধ সত্যেন। এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবের মুখে সুকান্তের প্রশংসা আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওতে সত্যেন বলেন, ‘কালীঘাট তৃণমূল থেকে চোর তৃণমূল হওয়ার পর এক নেতা সুকান্ত মজুমদারের প্রশংসা করছেন। এরা আসলে মাসতুতো ভাই। দুজনেই সামান্য ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন।’ (যদিও উত্তরবঙ্গ সংবাদ ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেনি)। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির কিছু নেতা তৃণমূলের সঙ্গে গোপন পরামর্শ করে দলের ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের বোঝাপড়াকে ‘নোংরামি’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি।
হঠাৎ কেন তাঁর এমন মনে হচ্ছে, জানতে সত্যেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে টেলিফোনে তিনি বলেন, ‘বিপ্লব মিত্র হঠাৎ সুকান্ত মজুমদারের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। তারপরেও এ নিয়ে সুকান্তবাবু কোনও কথা বলেননি। বিষয়টি অবাক লেগেছে। তাই নীরবতা ভেঙে প্রতিবাদ করেছি। অনেকে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন। গঙ্গারামপুরকে ধ্বংস করতে চাইলে তা হতে দেব না।’ গঙ্গারামপুরে সাংসদ কার্যালয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিধায়ক। সত্যেনের প্রশ্ন, ‘বালুরঘাটে সাংসদ অফিস রয়েছে। গঙ্গারামপুরে আলাদা অফিস করে এত টাকা খরচের কী দরকার?’ গঙ্গারামপুর কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসেবে সুকান্তকে মনোনীত করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলছেন, ‘দলের যে কোনও বুদ্ধিজীবীকে দেওয়া যেত। এমএলএ বা এমপিকেই দিতে হবে, এমন কোনও মানে নেই। বালুরঘাট কলেজে সাংসদকে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গারামপুরেও দেওয়ার যুক্তি দেখছি না।’
সত্যেনের এমন আচরণ অবশ্য ভালোভাবে নিচ্ছে না বিজেপির একটি বড় অংশ। যেমন দলের সাধারণ সম্পাদক সুবোধ সরকার বলছেন, ‘সুকান্ত রাজনীতিতে আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ তুলতে পারেননি বিরোধীরাও। শৃঙ্খলাপরায়ণ দল বিজেপি। কেন বিধায়ক এমন মন্তব্য করলেন, দল সেই কৈফিয়ত চাইতে পারে।’ বিপ্লবের পালটা বক্তব্য, ‘আমি এমন কোনও মন্তব্য করিনি, যাতে সত্যেনবাবুর রাগ হওয়ার কথা। সুকান্তবাবু তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী সভাপতি হতেই পারেন। আমি কি জোর করে তাঁকে মূর্খ, অশিক্ষিত বলব? আমরা যোগ্যতাকে সম্মান করি। নিম্নমানের রাজনীতি করি না।’ যদিও কালীঘাট তৃণমূলের নেতা মৃণাল সরকারের কটাক্ষ, ‘বিপ্লব মিত্রের বিজেপিতে যাওয়ার ভীষণ তাড়া রয়েছে। তাই বিজেপি নেতাদের গুণগান করে নিজের রাস্তা পরিষ্কার করছেন।’
সব মিলিয়ে, গঙ্গারামপুরে বিজেপির অন্দরে অসন্তোষের যে আঁচ ছিল, এখন তা ধিকধিক করে জ্বলছে। কিন্তু সত্যেনের মন্তব্য কি নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ, নাকি বিজেপির অন্দরে কোনও নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত—সেই জল্পনাই এখন জেলার রাজনীতিতে। এ বিষয়ে অবশ্য সুকান্ত মজুমদারের কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

