বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: ব্যাংককে টেক্কা দিয়ে মাত্র ২৫ মাসেই টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার টোপ! আর সেই লোভনীয় প্রতিশ্রুতিতে পা দিয়েই সর্বস্বান্ত হলেন উত্তর (Uttar Dinajpur) ও দক্ষিণ দিনাজপুরের (Dakshin Dinajpur) প্রায় ২০ হাজার মানুষ। তথাকথিত কোঅপারেটিভ ব্যাংকের আড়ালে চিটফান্ডের কায়দায় জাল বিছিয়ে প্রায় ৯০ কোটি টাকা (Monetary fraud rip-off) হাতিয়ে সপরিবারে চম্পট দিলেন মূল পান্ডা। এই বিরাট প্রতারণার পর্দা ফাঁস হতেই সোমবার সকাল থেকে উত্তাল হয়ে ওঠে রায়গঞ্জ থানার কর্ণজোড়া ফাঁড়ির কমলাবাড়ি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ঠুনঠুনি মোড় সংলগ্ন নোয়াপাড়া। প্রতারিত উপভোক্তাদের দফায় দফায় বিক্ষোভ, পথ অবরোধ ও অনশনে দিনভর চরম উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। ঘটনাস্থলে কর্ণজোড়া ফাঁড়ির ওসি পার্থ বর্মনের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। রাত পর্যন্ত চলে বিক্ষোভ। পুলিশ সুপার ডাঃ সোনাওয়ানে কুলদীপ সুরেশ বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত চলছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় দেড় দশক ধরে নোয়াপাড়ায় ব্যাংকের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রমরমিয়ে আর্থিক কারবার চালাচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা রতন সরকার ওরফে ঘচুম সরকার এবং তার পরিবারের চার সদস্য। কোনও সরকারি লাইসেন্স কিংবা রেজিস্ট্রেশন না থাকা সত্ত্বেও নিজেকে কোঅপারেটিভ সোসাইটির শীর্ষ আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিতেন রতন। গ্রামে গ্রামে এজেন্ট নিয়োগ করে প্রচার চালানো হত, ব্যাংকের চেয়ে বহুগুণ বেশি সুদ এবং মাত্র ২৫ মাসে আসল টাকা দ্বিগুণ করে ফেরত দেওয়া হবে। গ্রামবাসীর বিশ্বাস অর্জন করতে প্রথম ১০-১২ বছর ধরে নিয়মিত সুদ ও আসল ফেরতও দিতেন তাঁরা। কিন্তু সেই বিশ্বাসের ভিত শক্ত হতেই শুরু হয় আসল খেলা। অভিযোগ, গত আট মাস ধরে সমস্ত ধরনের লেনদেন ও টাকা ফেরত দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন অভিযুক্তরা। মেয়াদ উত্তীর্ণ পাসবই নিয়ে গেলে উপভোক্তাদের নানা অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হতে থাকে।
টাকা উদ্ধারের দাবিতে সকাল থেকে ঠুনঠুনি মোড়ে আমরণ অনশনে বসেন খাদিমপুরের বিশেষভাবে সক্ষম তরুণ ভবানন্দ বর্মন। তাঁর অভিযোগ, ‘২৫ মাসে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার কাছ থেকে ধাপে ধাপে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা নিয়েছেন রতন সরকার এবং তাঁর ভাই সুত্তম সরকার ওরফে নন্দ। এখন টাকা চাইতে গেলে গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ ভবানন্দর অনশন শুরু হতেই একে একে জমায়েত হতে থাকেন শয়ে-শয়ে প্রতারিত মানুষ।
চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ভাটিয়ার বাসিন্দা সারথি বর্মন বলেন, ‘আমি দু’লক্ষ টাকা দিয়েছিলাম। আমি বেকার ভাতা পাই, মাসে এক হাজার টাকা করে পাই। সেই টাকা ব্যাংক থেকে তুলে ওকে দিয়েছি। বলেছিল সুদ দেবে, সংসার চলে যাবে। আমার খুব অসুখ, টাকা চাইতে গেলাম, বলছে তুই মরে যা, আমি টাকা দেব না।’ আরেক আমানতকারী শালুক বর্মন গোস্বামী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘আমি ৪৫ হাজার টাকা রেখেছিলাম। ৫-৬ বছর হয়ে গেল। এখন টাকা চাইতে গেলে বলা হচ্ছে টাকা দেব না।’
আন্দোলনকারীদের দাবি, নোয়াপাড়া ও ঠুনঠুনি মোড় এলাকাতেই চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের প্রায় ৩০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর, বুনিয়াদপুর ও বালুরঘাট সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল মিলিয়ে আমানতকারীর সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি এবং প্রতারণার অঙ্ক ৯০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এলাকার বাসিন্দা জয়ন্ত রায়ের দাবি, ‘কোঅপারেটিভ সোসাইটি নামে ভুয়ো সংস্থা খুলে গরিব মানুষের টাকা মাসিক ৮ থেকে ৯ শতাংশ চড়া সুদে বাজারে খাটাত রতন। মাটি ও বালির ঠিকাদারি ব্যবসাতেও ওই টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। টাকা চাইতে গেলে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হত। আমরা পরিবারের পাঁচ সদস্যের অবিলম্বে গ্রেপ্তার চাই।’
বর্তমানে অভিযুক্ত রতন সরকার ও তাঁর পরিবারের মোবাইল সুইচড অফ, বাড়িতেও ঝুলছে তালা। রায়গঞ্জ পুলিশ জেলার কর্ণজোড়া ফাঁড়ির ওসি পার্থ বর্মনের বক্তব্য, ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছি। এটি একটি ভুয়ো সংস্থা। হতদরিদ্র গ্রামবাসীরা যাঁরা টাকা বিনিয়োগ করেছেন, তাঁরা যাতে টাকা ফেরত পান তার ব্যবস্থা করা হবে।’
অন্যদিকে, কোঅপারেটিভ সোসাইটির জেলা রেজিস্ট্রার সুমন সরকার সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘কোনও কোঅপারেটিভ ব্যাংক বা সোসাইটি খুলতে গেলে নির্দিষ্ট আইনি বিধি এবং রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কোথাও টাকা লগ্নি করার আগে সাধারণ মানুষের উচিত বৈধ কাগজপত্র যাচাই করে সম্পূর্ণ সচেতন হওয়া।’

