আলিপুরদুয়ার: আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলায় দীর্ঘকাল ধরেই বড় শিল্পের অভাব। চা শিল্প থাকলেও তা স্থায়ী কর্মসংস্থানের ঠিকানা দিতে পারছে না। বর্তমান রাজ্য সরকার পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা নিলেও এখনও পর্যন্ত জেলায় কোনও ভারী শিল্প বা বড় কারখানা গড়ে তোলার আভাস তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে শিল্পের মানচিত্র প্রসারিত করতে এবং বেকারত্ব দূর করতে এবার ছোট ও মাঝারি শিল্পের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবার আসরে নেমেছে জেলা উদ্যানপালন বিভাগ। তাদের প্রধান হাতিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প ‘প্রধানমন্ত্রী ফর্মালাইজেশন অফ মাইক্রো ফুড প্রসেসিং এন্টারপ্রাইজেস (পিএমএফএমই)’ (PMFME)।
এই বিশেষ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে আলিপুরদুয়ারজুড়ে মাইক্রো ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরি (Micro meals processing manufacturing unit) বা ছোট খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা খোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই জেলাজুড়ে এই প্রকল্পের প্রচার জোরকদমে শুরু হয়েছে। জেলার প্রতিটি ব্লকে নির্দিষ্ট শিবির করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে এবং প্রকল্পের সুযোগসুবিধা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, এই প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে কারা শিল্প স্থাপন করতে আগ্রহী, তার সুনির্দিষ্ট সমীক্ষাও চালানো হচ্ছে। কেউ এই প্রক্রিয়ায় আগ্রহী হলে তাঁকে সরাসরি উদ্যানপালন বিভাগে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা উদ্যানপালন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সুমন কর বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে যে কেউ খুব সহজেই ছোট বা মাঝারি মাপের ফ্যাক্টরি খুলতে পারবেন। এর ফলে শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিল্প ছড়িয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক গতি আসবে। বর্তমানে আগ্রহীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।’ এই প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ নতুন কোনও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের ফ্যাক্টরি যেমন খোলা সম্ভব, তেমনই পুরোনো কোনও ফ্যাক্টরি থাকলে তার আধুনিকীকরণ বা সম্প্রসারণও করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে কোনও বড় কারখানা তৈরির পরিবর্তে ছোট আকৃতির ফ্যাক্টরি খোলার ওপরই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
কেউ যদি এই প্রকল্পের আওতায় নিজস্ব ফ্যাক্টরি খুলতে এগিয়ে আসেন, তবে কারখানা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে মোটা অঙ্কের ভরতুকি দেওয়া হবে। এই ভরতুকির পরিমাণ সর্বাধিক ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা মোট খরচের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হচ্ছে। উদ্যোক্তাকে কারখানা চালুর জন্য মাত্র ১০ শতাংশ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে এবং বাকি অর্থ ব্যাংকঋণ হিসেবে নেওয়া যাবে। পরবর্তী সময়ে সরকারি ভরতুকির অর্থ দিয়েই সেই ঋণ অনেকাংশে মেটানো সম্ভব হবে। শুধু আর্থিক সহায়তা প্রদানই নয়, ফ্যাক্টরি খোলার পর সংশ্লিষ্ট খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে সরকারের তরফে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। কীভাবে পণ্যের সঠিক মার্কেটিং করতে হবে এবং নিজের ব্যবসার একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করা যাবে, তার সমস্ত কৌশল সেখানে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেওয়া হবে।
আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং চাহিদার ওপর ভিত্তি করে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ফ্যাক্টরি গড়ে তোলার বিশাল সম্ভাবনা খুঁজে বের করা হয়েছে। যেমন— যে সমস্ত অঞ্চল কৃষিভিত্তিক, সেখানে আলু বা অন্যান্য ফলমূল থেকে চিপস কিংবা সস তৈরির কারখানা স্থাপন করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, শহরাঞ্চল ও জনবহুল এলাকায় বেকারি এবং মিষ্টির কারখানা গড়ার ওপর বেশি জোর দেওয়া যেতে পারে। উদ্যানপালন বিভাগের আধিকারিকদের দাবি, দেশের অন্যান্য অনেক রাজ্যেই এই প্রকল্পের হাত ধরে বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন এবং ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন।
তবে এতকিছুর পরেও এই প্রকল্পের প্রচারের ঘাটতি নিয়ে কিছু মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আলিপুরদুয়ার চেম্বার অফ কমার্সের সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ দে বলেন, ‘এই ধরনের কোনও লাভজনক প্রকল্প সম্পর্কে আমাদের বাণিজ্য সংগঠনকে দপ্তর থেকে কিছু জানানো হয়নি। অতীতে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হলেও বাস্তবায়নের সময় অনেক জটিলতা ও সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। সেই কারণে অনেকের মধ্যেই এক ধরনের মানসিক ভয় বা সংশয় কাজ করছে। সেই ভয় ও দূরত্ব কাটানো একান্ত প্রয়োজন।’ যেহেতু রাজ্যে নতুন সরকার, তাই সমস্ত প্রকল্পের সুযোগসুবিধা আগ্রহীরা পাবেন এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত হবে এমনটাই আশা তাঁদের।

