উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: যেন চোখের পলকে সব শেষ! মাথার উপর আচমকাই আছড়ে পড়েছিল এক নরকীয় তাণ্ডব। ইরানের আকাশে রুটিন মিশনে থাকা মার্কিন বায়ুসেনার ঝাঁ-চকচকে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল (F-15 Strike Eagle) যুদ্ধবিমানটি (Iran Conflict) তখন মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় এক তাল লোহলক্কড়ে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি যখন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে, তখন ককপিটে থাকা দুই সেনা আধিকারিক—যাঁদের পোশাকি নাম ‘আলফা’ এবং ‘ব্রাভো’—জীবনের টানে বাধ্য হন ইজেক্ট করতে। পাইলট আলফা সৌভাগ্যবশত সুরক্ষিতভাবে মাটিতে নেমে দ্রুত উদ্ধার হলেও (US Pilot Rescue), পেছনের সিটের ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার ‘ব্রাভো’র কপালে অপেক্ষা করছিল আরও ভয়ংকর এক পরিণতি।
শত্রুর ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাঁর প্যারাশুটটি। মাঝআকাশে মাথা তুলে ওই অফিসার যখন দেখেন মাথার ওপর ছাতাটা আর নেই, তখন বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। মুক্ত পতনের মতো প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬১ কিলোমিটার গতিতে তিনি সজোরে আছড়ে পড়েন ইরানের কোনো এক দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায়। তীব্র অভিঘাতে তাঁর পিঠের শিরদাঁড়া, একটি হাত এবং কাঁধের একাধিক হাড় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মুখ ও মাথাতেও লাগে গভীর ক্ষত। চারপাশে শত্রুসেনার কড়া পাহারা, পকেটে জল বা এক দানাও খাবার নেই—এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শুরু হয় তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার অধ্যায়।
কিন্তু হার মানার পাত্র ছিলেন না ওই মার্কিন কর্নেল। ভাঙা শরীর আর প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি নিজেকে বুঝিয়েছিলেন, শত্রুর টিভিতে বন্দি হিসেবে মুখ দেখানোর চেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই ঢের ভালো। এই জেদেই প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু এক পাহাড়ি খাঁজে কোনোমতে চিরে চিরে উঠতে শুরু করেন তিনি। পাতার আড়ালে, পাথরের খাঁজে লুকিয়ে একটু একটু করে অবস্থান বদলাতে থাকেন ব্রাভো। এদিকে তখন আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের রাতের ঘুম উবে গেছে। প্রায় দেড় হাজার ইরানি সেনা যখন ওই দুর্গম চত্বরে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে, ঠিক তখনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক ঐতিহাসিক উদ্ধার অভিযানে নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
চল্লিশেরও বেশি বছর পর এই প্রথম সরাসরি ইরানের মাটিতে পা রাখেন মার্কিন জওয়ানরা। আকাশপথে বোমারু বিমান ও ড্রোনের কড়া নজরদারির মাঝে চলতে থাকে নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট। টানা ৫০ ঘণ্টা জল-খাবারহীন অবস্থায় পাহাড়ের ঠান্ডায় জমে যাওয়ার জোগাড় হলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি ব্রাভো। শেষ পর্যন্ত মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের দুই সদস্য যখন অন্ধকার চিরে তাঁর সামনে এসে হাজির হন, তখন রুদ্ধশ্বাস সেই মুহূর্ত যেন রূপকথকেও হার মানায়। ভাঙা শরীর নিয়ে শুধু এটুকু বলতে পেরেছিলেন—”চলো, এগোই।” চরম নাটকীয়তা আর অদম্য সাহসিকতার সুতোয় বাঁধা এই উদ্ধারকাহিনি এখন খোদ আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে এক আধুনিক রূপকথা হিসেবেই চর্চিত হচ্ছে।

