শিলিগুড়ি : ‘শিলিগুড়ি করিডর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর সুরক্ষা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও মজবুত করতে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় সরকারের। দার্জিলিং জেলার বাগডোগরা থেকে পানিট্যাঙ্কি ও খড়িবাড়ি হয়ে গলগলিয়া পর্যন্ত ৩১.০২ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩২৭ নম্বর জাতীয় সড়কটি চার লেনের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য ২,০৭৭.১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও হাইওয়ে মন্ত্রী নীতিন গড়করি।
এই পরিকল্পনায় বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি এবং পানিট্যাঙ্কির যানজটের সুরাহার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্ট বলছেন, ‘চার লেনের সড়ক হলে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহণে অনেক সুবিধা হবে। এটি বাগডোগরা বিমানবন্দরে যাতায়াত আরও সহজ করবে। সর্বোপরি এতে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও মজবুত হবে।’
চার লেনের সড়কে তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ (আরওবি) তৈরি করা হবে। রাস্তার দু’ধারে থাকবে সার্ভিস রোড। তবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে নজরকাড়া দিকটি হল বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের আধুনিক চিন্তাভাবনা। উত্তরবঙ্গের জঙ্গল লাগোয়া রাস্তাগুলিতে প্রায়ই বন্যপ্রাণী-যানবাহন সংঘর্ষ হয়। অনেক সময় বন্যপ্রাণীর মৃত্যুও হয়। এনিয়ে পরিবেশপ্রেমীরা দীর্ঘদিন ধরে সরব। সেকারণে এমন ঘটনা এড়াতে এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ যাতায়াত সুনিশ্চিত করতে সড়কে পাঁচটি ‘এলিফ্যান্ট আন্ডারপাস’ বা হাতি চলাচলের বিশেষ পথ নির্মাণ করা হবে।
কৌশলগত দিক থেকে ‘শিলিগুড়ি করিডর’ অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষা হয়। চার লেনের নয়া রাস্তা নির্মাণ হলে শুধু যে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ সুদৃঢ় হবে তা-ই নয়, প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশে যাতায়াত ও বাণিজ্যের পথও মসৃণ হবে।
পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ মনে করছেন, এই সড়ক উত্তরবঙ্গের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। তাঁর বক্তব্য, ‘শিলিগুড়ি করিডরকে সুরক্ষিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার সবরকমভাবে সচেষ্ট। নতুন রাস্তা তারই একটা অন্যতম পদক্ষেপ।’ পাশাপাশি পর্যটনেও জোয়ার আসবে বলে মন্ত্রীর ধারণা।
বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি এবং পানিট্যাঙ্কি এলাকায় নিত্যদিন তীব্র যানজট হয়। চার লেনের সড়কে এই সমস্যা মিটবে। বাগডোগরা বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও আর জ্যামে আটকে উড়ান মিসের আশঙ্কায় ভুগতে হবে না। পানিট্যাঙ্কি হয়ে প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী ট্রাক নেপালে ঢোকে। সরু রাস্তার কারণে পণ্য পরিবহণে যে বিপুল সময় নষ্ট হয়, তা বাঁচবে।
অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের কৃষক, ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবেন। উত্তরের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত চা শিল্প, কৃষি এবং উদ্যানপালনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত ফসল, আনারস বা বাগানের কাঁচা চা পাতা দ্রুত বড় বাজারে পৌঁছে দিতে রীতিমতো কালঘাম ছোটে কৃষকদের। চার লেনের সড়ক চালু হলে চা, শাকসবজি এবং অন্য কৃষিজাত পণ্য খুব সহজে এবং কম সময়ে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে এলাকার আর্থিক বুনিয়াদও মজবুত হবে।
কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ (সিআইআই)-এর উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক শাখার চেয়ারম্যান সতীশ মিত্রুকার কথা, ‘খুব ভালো উদ্যোগ। এটা শিলিগুড়ি রিং রোড তৈরির প্রথম ধাপ। এর ফলে শিলিগুড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে এবং শিল্পে বিনিয়োগও বাড়বে।’

