Siliguri | অর্থের ক্লাসে মন্ত্রী, বিধায়কের হাত মাউসে, ছাত্রের ভূমিকায় আনন্দ-দুর্গা

শিক্ষা
Spread the love


নীতেশ বর্মন, শিলিগুড়ি : শেখার কি কোনও বয়স হয়? দায়িত্ব যত বাড়ে, জানার পরিধিও কি ততটা বাড়ানো দরকার? শিলিগুড়ি মহকুমার দুই বিধায়কের গল্প যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর। দুজনেই দু’বারের বিধায়ক। একজন রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী। অন্যজনও মানুষের কাজ করতে গিয়ে বুঝেছেন, আরও কিছু শেখা প্রয়োজন। তাই একজন অর্থনীতির পাঠ নিচ্ছেন, অন্যজন শিখছেন কম্পিউটার।

আনন্দময় বর্মনের পড়াশোনার পরিধি কম নয়। বাংলা সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস সহ বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। পেশায় হাইস্কুল শিক্ষক আনন্দময় এখন রাজ্যের অর্থ ও পরিবহণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী। অর্থ দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অবশ্য বুঝেছেন, শুধু নিজের জানা বিষয়গুলির মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না। অর্থনীতি আরও ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।

তাই ফের ছাত্রের ভূমিকায় আনন্দময়। অর্থনীতির পড়াশোনায় মন দিয়েছেন তিনি। নিচ্ছেন অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ। আর তাঁর শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান তথা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিিড়।

আনন্দময়ের কথায়, ‘শেখার শেষ নেই। রাজ্যে বিরোধী দল হিসাবে থাকার সময় অর্থের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ছিলাম। রাজ্যের অর্থ দপ্তরের হিসেব এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে আরও অনেক কিছু জানা প্রয়োজন। সেজন্য অশোক লাহিিড়র মতো দক্ষ মানুষের পরামর্শ খুব জরুরি।’

শুধু অশোক লাহিিড় নন, রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখছেন বলে জানিয়েছেন আনন্দময়। অর্থনীতি ও রাজকোষ পরিচালনার নানা বিষয় নিয়ে অশোক লাহিিড়র সঙ্গে নিয়মিত কথা হচ্ছে তাঁর। আপাতত ফোনের ওপার থেকেই চলছে সেই পাঠ।

রাজ্য বাজেট পেশের সময় কীভাবে আয় বৃদ্ধি করা যায়, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, মানুষের ঘরে নগদ অর্থ প্রদান থেকে খরচের হিসেব- এমন নানা বিষয় জানতে চেয়েছেন আনন্দময়। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির হাল ফেরাতে কী করণীয়, তা নিয়েও পরামর্শ নিয়েছেন।

অশোক লাহিিড়র বক্তব্য, আনন্দময় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তাঁর কাছে নানা বিষয় জেনে নেন। তবে আনন্দময়ও কম জানেন না। ভালো কাজ করবেন বলেই তিনি আশাবাদী। রাজ্যের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির রূপরেখা নিয়েও দুজনের মধ্যে কথা হয়েছে।

ব্যস্ততার কারণে এখন ফোনেই পাঠ চলছে। তবে আগামীদিনে দিল্লিতে গিয়ে অশোক লাহিিড়র মুখোমুখি বসে সরাসরি ক্লাস করার ইচ্ছা রয়েছে আনন্দময়ের। রাজকোষের হিসেব এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যই তাঁর এই উদ্যোগ।

অন্যদিকে, শেখার টেবিলে বসেছেন ফাঁসিদেওয়ার বিজেপি বিধায়ক দুর্গা মুর্মুও। বিষয় তাঁর কম্পিউটার।

ঘোষপুকুরে নিজের বিধায়ক কার্যালয়ে নতুন কম্পিউটার বসিয়েছেন দুর্গা। মাউস ধরা থেকে সিলেক্ট করা, কপি-পেস্ট, সার্চ বা খোঁজার কাজ- এক এক করে শিখছেন সবই। এজন্য রাখা হয়েছে একজন প্রশিক্ষকও। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা, কাজের ফাঁকে আরও বেশি সময় কম্পিউটারের পিছনে দিতে চাইছেন তিনি।

কেন হঠাৎ কম্পিউটার শেখার আগ্রহ?

এর পিছনে রয়েছে মানুষের কাজ করার তাগিদ। দুর্গার দাবি, অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্পে বিধানসভার বেশিরভাগ মহিলা সুবিধা পেলেও চা বাগানের একাংশের উপভোক্তারা নানা সমস্যায় পড়ছেন। আবেদন জমা দেওয়ার সময় ভুলত্রুটি ধরা পড়ছে। ফলে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকে প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তাঁর দাবি।

সমস্যা নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন সরকারি অফিস কিংবা কম্পিউটার সেন্টারে যাচ্ছেন। সেখানেও হয়রানির অভিযোগ উঠছে। এমনকি প্রকল্পের টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে কি না, তা জানতে গিয়েও বাইরে টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ দুর্গার।

এই পরিস্থিতিতে বিধায়ক কার্যালয়ে মানুষের ভিড়ও বাড়ছে। তাই এবার সমস্যাগুলি নিজেই খতিয়ে দেখতে চান দুর্গা। কোথায় ভুল রয়েছে, তা কম্পিউটারে দেখে নেবেন। প্রয়োজন হলে অনলাইনে আবেদনও করে দেবেন। শুধু অন্নপূর্ণা যোজনা নয়, আরও বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পেতেও মানুষকে অনলাইনে সাহায্য করার কথা জানিয়েছেন তিনি।

দুর্গার কথায়, ‘ছোটবেলায় সেভাবে কম্পিউটার শেখা হয়নি। নতুন করে শিখছি। তাতে অনেক কাজই দ্রুত করা যাচ্ছে।’

কয়েকদিনের মধ্যেই কম্পিউটারের অনেক কিছু শিখে ফেলেছেন বলে তাঁর দাবি। আনন্দময় বর্মনের চোখেও বিষয়টি প্রশংসার। তাঁর কথায়, ‘দুর্গাদা বরাবরই শিখতে চান। মানুষের কাজ করতে যেমন ওঁর আগ্রহ রয়েছে, কম্পিউটার শেখার ক্ষেত্রেও। নিজের এবং মানুষের উপকারে অনেক কাজে লাগবে।’

তবে দুর্গার কম্পিউটার শেখা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যও এসেছে। দার্জিলিং জেলা সিপিএমের সম্পাদক সমন পাঠক বলছিলেন, ‘বিজেপি নেতাদের অনেকেই এখনও ডিজিটাল মাধ্যমে সাবলীল নন। বিধায়ক শিখছেন, ভালো কথা। কিন্তু তিনি শিখলেই তো আর হবে না। চা বাগানের ছেলেমেয়েদেরও তো শেখাতে হবে। তবেই তো বাগানের মানুষ ডিজিটাল হবেন।’

দুর্গার পালটা দাবি, স্কুল-কলেজ থেকে সরকারি-বেসরকারি নানা ক্ষেত্রে কম্পিউটার শেখানোর ব্যবস্থা বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর চালু করেছে। বামেরা ৩৪ বছরের শাসনকালে মানুষকে ডিজিটাল হতে দেয়নি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

দুজনের শেখার বিষয় আলাদা। একজনের হাতে রাজ্যের অর্থ দপ্তরের দায়িত্ব, তাই অর্থনীতির গভীরে ঢুকতে চাইছেন। অন্যজন মানুষের কাজ দ্রুত করতে কম্পিউটার আয়ত্ত করছেন। দুজনেই দু’বারের বিধায়ক। তবু শেখার জায়গায় তাঁরা আবার ছাত্র।

হয়তো এটাই শেখার আসল সৌন্দর্য- জানার শেষ নেই। দায়িত্ব যত বড়ই হোক, নতুনকে চেনা-জানার আগ্রহটা বাঁচিয়ে রাখাই মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন করে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *