উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: মানচিত্রে স্পেন আর পর্তুগালের অবস্থান একেবারে পাশাপাশি। মাঠের লড়াইয়েও দুই প্রতিবেশী দেশের ভাগ্য যেন একই সুতোয় বাঁধা পড়ল। বিশ্বকাপের শুরুতে দুই হেভিওয়েট দল যে এভাবে হোঁচট খাবে, তা হয়তো ফুটবলপ্রেমীদের কল্পনার অতীত ছিল। কিছুদিন আগেই পুঁচকে কেপ ভার্দের (Cape Verde) কাছে আটকে গিয়েছিল ইউরোপসেরা স্পেন। এবার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিরুদ্ধে ধারেভারে বহুগুণ এগিয়ে থেকেও জয় অধরা রয়ে গেল পর্তুগালের (Portugal Vs DR Congo)। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র হয়।
দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছে কঙ্গো। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর (Cristiano Ronaldo) মতো শক্তিশালী পর্তুগাল। অথচ আফ্রিকান এই দেশটির প্রস্তুতি ছিল কার্যত শূন্য। দেশে ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় টানা ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে বন্দি ছিলেন স্যামুয়েল মুথুস্বামীরা। প্রস্তুতির সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও, একবুক সাহস সম্বল করে মাঠে নেমেছিলেন তাঁরা।
প্রথম ৬ মিনিটে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পরও দমে যায়নি কঙ্গো। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে লাফিয়ে উঠে মাথা ছুঁইয়ে ইতিহাস গড়েন ইয়োআন উইজা। বিশ্বকাপে কঙ্গোর ইতিহাসে এটিই প্রথম গোল এবং এই ড্র-এর মাধ্যমে তারা অর্জন করল বিশ্বকাপের প্রথম পয়েন্ট।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য অন্যরকম ইঙ্গিত দিচ্ছিল। প্রথমার্ধের মাত্র ৬ মিনিটেই পেদ্রো নেতোর নিখুঁত ক্রস থেকে অনবদ্য এক হেডে পর্তুগালকে এগিয়ে দেন জোয়াও নেভেস (Joao Neves)। মাঠজুড়ে তখন শুধুই লাল জার্সিধারীদের দাপট। কিন্তু প্রথম ১৫ মিনিটের ধাক্কা সামলে নিয়েই রক্ষণ জমাট করেন কঙ্গোর স্টিভ কাপাউদিরা।
এরপর থেকে পর্তুগালের হতাশার শুরু। মাঝমাঠে ভিতিনহা দুর্দান্ত পরিশ্রম করলেও কঙ্গোর দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের দেয়াল ভাঙা সম্ভব হয়নি। উলটে পর্তুগালের রক্ষণে ধরা পড়েছে স্কুল পর্যায়ের গাফিলতি। রেনাতো ভেগা এবং টমাস আরাউখোর বোঝাপড়ার অভাব ছিল স্পষ্ট। উইজা যখন হেডে গোল করছেন, তখন পর্তুগিজ ডিফেন্ডারদের কাউকেই তাঁর ধারেকাছে দেখা যায়নি। ভিআইপি বক্সে বসে পেপে কিংবা ডাগআউটে বসে রিকার্ডো কার্ভালহোরা নিশ্চয়ই নিজেদের উত্তরসূরিদের এই রক্ষণ দেখে হতাশ হয়েছেন।
লিয়োনেল মেসি, আর্লিং হালান্ড কিংবা কিলিয়ান এমবাপের মতো সমসাময়িক তারকারা যখন বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই গোল পেয়ে গেছেন তখন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র সিআর (CR7) সেভেনের শিবিরে।
বয়স্কতম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে মাঠে নেমে এদিন নজির গড়লেও, ম্যাচের একটা বড় সময় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাতার বিশ্বকাপে তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো সান্তোসের সঙ্গে রোনাল্ডোর দূরত্বের গল্প সবার জানা। সান্তোসের বিদায়ের পর বর্তমান কোচ রবার্তো মার্তিনেজ় ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর দল হবে রোনাল্ডো-কেন্দ্রিক। সেই ভরসা থেকেই ৪১ বছর বয়সী মহাতারকার হাতে উঠেছিল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড।
কিন্তু মাঠের পারফর্ম্যান্স সেই আস্থার প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে রোনাল্ডো হাতে গোনা কয়েকটি বল ছুঁয়েছেন। উইংয়ে গতি হারিয়েছেন, এমনকি বল কেড়ে নেওয়ার ন্যূনতম প্রয়াসও তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সিসকো কনসেসাওয়ের বাড়ানো দুটি সহজ সুযোগে ঠিকঠাক পা ছোঁয়াতেও ব্যর্থ হন, উল্টে মাঠে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। এক সময় মনে হচ্ছিল, পর্তুগাল আসলে ১০ জনে খেলছে।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই পর্তুগিজ শিবিরে ক্ষোভের আগুন। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, বের্নার্দো সিলভা বা ভিতিনহাদের মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডাররা ক্লাব ফুটবলে নায়ক হলেও, দেশের জার্সিতে তাঁদের রসায়ন এদিন জমেনি। ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফর্মার ভিতিনহাকে যখন শেষ মুহূর্তে তুলে নেওয়া হলো, তখনও নিষ্প্রভ রোনাল্ডো মাঠে থেকে গেলেন।
কোচ রবার্তো মার্তিনেজের (Roberto Martinez) পরিবর্তনগুলো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিরতির পর কনসিসাওকে নামানো হলেও, তাঁর একটি চমৎকার বাইসাইকেল কিক অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। একদম শেষ মুহূর্তে নামানো হলো আগের বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিককারী গন্সালো রামোসকে। অথচ জোয়াও ফেলিক্সের মতো সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার পুরো ম্যাচ বসে রইলেন বেঞ্চে।
পর্তুগালের এই সোনালি প্রজন্মকে নিয়ে মার্তিনেজ় যদি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারেন, তবে তাঁর ভাগ্যও যে সাবেক কোচ সান্তোসের মতোই হতে পারে— সেই দেওয়াল লিখন কিন্তু প্রথম ম্যাচেই স্পষ্ট।

