সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: দুপুরে ভাতের সঙ্গে জমিয়ে চিকেন কষা, কিংবা সন্ধ্যায় চায়ের সঙ্গে গরম গরম চিকেন পকোড়া জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির ফুড চার্টে। সস্তায় পুষ্টিকর ভেবে অনেকেই কিনে আনছেন ব্রয়লার মুরগি (Rooster)। কিন্তু সেই মুরগিকে ঝড়ের গতিতে বড় করে তুলতে কী কী ফন্দি খাটাচ্ছেন একশ্রেণির চাষি, সেই খোঁজ আদৌ তাঁরা রাখেন কি?
যদিও হাইব্রিড মুরগির মাংস নিয়ে খুঁত দেখেন না মৎস্য দপ্তরের তাবড় কর্তারা। রাজ্য প্রাণীসম্পদ দপ্তরের জলপাইগুড়ির উপ অধিকর্তা অভিজিৎ মণ্ডলের কথায়, হাই ক্যালোরি ফিড খাওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের ফলে জিনগতভাবে উন্নত চাষের মুরগির দ্রুত ওজন বাড়ে। এর মাংস ক্ষতিকর হওয়ার কথা নয়, বরং মানুষের নির্ধারিত পরিমাণ পুষ্টি বিধানে সস্তার উপায় এটি।
বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ থেকে বিভাগীয় সরকারি আধিকারিকরা ফার্মে চাষ করা যে মুরগির মাংসের কথা বলেন, তা এর আদর্শ রূপ। আসল খেল হয় বিভিন্ন কোম্পানির দাদন এবং ব্যক্তিগত বহু ফার্মে। চটজলদি ওজন বাড়িয়ে বাজারজাত করার জন্য ব্রয়লার মুরগির জিন বদল থেকে কোষ বিভাজন দ্রুত করতে রাসায়নিকযুক্ত খাবার, স্টেরয়েড, হরমোন ইনজেকশন, নিকেল, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, সিসার মতো ভারী ধাতুযুক্ত খাবার খাইয়ে দেওয়া হয় মুরগিকে। দেওয়া হয় মারাত্মক অ্যান্টিবায়োটিক। এরপর সেই ক্ষতিকর সমস্তকিছু মাংসের সঙ্গে মানব শরীরে ঢোকে এবং তৈরি করে নানা রোগ। এই মুহূর্তে শুধু জলপাইগুড়ি জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মুরগির ফার্ম রয়েছে। বেশিরভাগ কোম্পানির দাদনে চুক্তিতে মুরগি পালন করে। সাধারণত ডিম থেকে ছানা বের হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফার্মে পৌঁছে যাওয়া মুরগির ওজন থাকে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম। এরপর কোন জাদুমন্ত্রবলে মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে সেগুলির গড় ওজন দাঁড়ায় প্রায় আড়াই কেজি! এই হিসেবে দৈনিক গড়ে প্রায় ৬২ গ্রাম ওজন বাড়ে মুরগিগুলির।
উত্তরবঙ্গে সাত থেকে আটটি কোম্পানি ফার্ম মালিকদের মুরগি চাষের দাদন দিচ্ছে। চাষিদের ছানা, খাবার, ওষুধ এবং টিকা পৌঁছে দিচ্ছে। চাষিদের খরচ ছাউনি সহ পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ এবং জল। কোম্পানির তরফে চাষিকে কেজিপ্রতি মাংস তৈরির খরচ বেঁধে দেওয়া হয় ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। এজন্যে কেজিপ্রতি গড়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা কমিশন পান চাষি। কোম্পানির নির্ধারিত খরচের থেকে যদি কম খরচ চাষি করতে পারেন, তাহলে অতিরিক্ত বোনাস মেলে। এই বোনাসের লোভে ৪০ বা ৪২ দিনের বদলে ৩৫ দিনে মুরগিকে নির্ধারিত ওজনে পৌঁছে দিতে মরিয়া হয়ে যান অনেকে। তখনই কোম্পানির দেওয়া খাবার এবং ওষুধের সঙ্গে নিজেদের আনা বিশেষ ওষুধ খাওয়ানো শুরু হয় মুরগিকে। নাম গোপনের শর্তে জেলার এক ফার্ম মালিক বলেন, বাংলাদেশ এবং নেপাল থেকে কিছু ইনজেকশন এবং বিশেষ খাবার আসে। যা খেলে মুরগির গ্রোথ ম্যাজিকের মতো দ্রুত হয়। একজন ফার্ম মালিক বছরে ৫ বার চাষ করতে পারেন। তবে বিদেশি ইনজেকশন এবং খাবার ব্যাপকভাবে ব্যবহার করলে সাত চালান উঠে যায় প্রতি বছর।
এই ধরনের মুরগি পাইকারি দরে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির পর ঘুরপথে বেশিরভাগটাই সস্তায় স্ট্রিট ফুডের স্টল থেকে রেস্তোরাঁয় আসে। সেই মুরগির মাংসের হরেক পদ চেটেপুটে খাওয়ার পর আর যাই হোক পুষ্টি হয় বলে বিশ্বাস করেন না খোদ চাষিরাই।
