Position of Aged | জীবনের বাঁকে ভরসার বটবৃক্ষ, আধুনিক সমাজে প্রবীণদের অপরিহার্যতা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

জানলা দিয়ে বিকেলের ম্রিয়মাণ রোদ এসে পড়েছে অবিনাশবাবুর (নাম পরিবির্তত) বিছানার চাদরে। বাহাত্তর বছরের মানুষটির চোখের দৃষ্টি আগের মতো আর প্রখর নেই। কাঁপা হাতে চশমার কাচটা মুছছেন তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর ফেলে যাওয়া একটি পুরোনো শাড়ি থেকে কেটে নেওয়া এক টুকরো কাপড় দিয়ে। শিবমন্দিরের ঘরটায় কেমন একটা ওষুধের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে জমাট বাঁধা একাকিত্ব। একসময় মালদার নামকরা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। অবসরের পর শিলিগুড়ির শিবমন্দিরের বাড়িই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। একসময় তাঁর এক হাঁকে শান্ত হয়ে যেত শত শত ডানপিটে কিশোর। আর আজ নিজের আজীবন পরিশ্রমে তৈরি করা বিশাল বাড়িতেই তিনি এক কোণে পড়ে থাকা বাতিল আসবাবের মতো (Position of Aged)।

ছেলে-মেয়ে, বৌমা সবাই প্রতিষ্ঠিত, আধুনিকতার ইঁদুর দৌড়ে তাঁরা ভীষণ ব্যস্ত। তাঁদের সেই ঝলমলে জীবনে অবিনাশবাবুর পুরোনো মূল্যবোধ, নীতি বা অভিজ্ঞতার কোনও জায়গা নেই। দামি নার্সিংহোমে চিকিৎসা আর নামীদামি ওষুধ কিনে দেওয়ার মধ্যেই তাঁরা তাঁদের দায়িত্বের সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। অবিনাশবাবু বোঝেন সবটা, তাই অভিমানে, নিজের আত্মসম্মানটুকু বাঁচাতে একটা গণ্ডি তৈরি করে নিয়েছেন এই নিঃসঙ্গ চার দেওয়ালের মাঝে। বাড়িতে তাঁর দেখভালের জন্য থাকা মাসিই আপাতত তাঁর ভরসা।

তবুও মন খারাপ হলে, বেকায়দায় পড়লে বেসরকারি ব্যাংকের উঁচু পদে কর্মরত ছেলে রাতবিরেতে দরজা খুলে বাবার পাশে এসে বসেন। বাবার কথায় ভরসা পান। মেয়ের সংসারে অশান্তি হলে এখনও ফোন যায় বাবার কাছেই। কয়েক মাস আগে নাতি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে সবার চোখ এড়িয়ে এসে চুপচাপ দাদুর ঘরে বসে ছিল। দাদু তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে নাতির মনে আশার আলো জ্বেলে দেন। প্রবীণদের ঘরে ঢোকার এই দরজাটাই সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। মনোবিদরাও সেকথাই বলছেন। অবিনাশবাবু সেসব শুনে হাসেন। কথার মাঝেই মোবাইলে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। প্রেশারের ওষুধ খেয়ে বলেন, ‘বুঝলে বাবা, দিনশেষে দিগভ্রান্ত মানুষ ঠিক ফিরে আসে সেই পুরোনো বট গাছটার কাছেই।’

মনোবিজ্ঞানী সপ্তর্ষী চট্টোপাধ্যায়ের কথা, ‘আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, প্রত্যেকেরই জীবনের অন্ধকারে একটা ভরসার লাঠি প্রয়োজন হয়। পরিবার বা সমাজের প্রবীণরা সবসময় সেই লাঠির মতো কাজ করেন, আমাদের সঠিক রাস্তা দেখান। বর্তমান সমাজে এত অবক্ষয়, হানাহানি, নীতিবোধের অভাবের একটাই কারণ, আমরা আমাদের অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকদের অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছি।’

একটি সমাজ যদি শুধু নবীনদের উপর দাঁড়ায়, তবে তার গতি থাকে, কিন্তু স্মৃতি থাকে না। আর স্মৃতিহীন গতি অনেক সময় মানুষকে খুব দ্রুত ভুল জায়গায় পৌঁছে দেয়। নতুন প্রজন্মের উদ্যম প্রয়োজন, কিন্তু সেই উদ্যমের পাশে এমন মানুষও প্রয়োজন, যাঁরা জানেন উত্তেজনা আর সাহসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, প্রতিবাদ আর প্রতিহিংসার মধ্যে সীমারেখা কোথায়, ক্ষমতা আর কর্তৃত্বের মধ্যে ফারাক কোথায়। সেখানেই প্রবীণরা সর্বকালে সর্বদেশে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। তাই নবীনের হাতে ভবিষ্যৎ থাকুক, প্রবীণের হাতে থাকুক সেই ভবিষ্যতের দিশা।

পৃথিবী দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের হিসাবে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ২০৩০ সালে ১৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে এবং ২০৫০ সালে তা ২০০ কোটিতে উঠবে।  ভারতে ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৪.৬ কোটি, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ হতে পারে বলে রাষ্ট্রসংঘে একটি ভারতীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রবীণরা সমাজের প্রান্তিক কোনও অধ্যায় নয়, তাঁরা আগামী সমাজের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক হতে চলেছেন।

মনোবিদ উত্তম মজুমদারের বক্তব্য, ‘প্রবীণরাই সেই জীবন্ত আয়না, যাকে অবহেলায় ভেঙে ফেললে আমাদের নিজেদের মুখ দেখার আর কোনও জায়গাই অবশিষ্ট থাকবে না। জীবনের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে প্রয়োজন অভিজ্ঞতার। সেই প্রশ্নের উত্তর ইন্টারনেট আর প্রযুক্তির কাছে পাওয়া যাবে না। একদিনের সম্মান বা করুণা নয়, পরিবার এবং সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার রয়েছে প্রবীণদের। সেটা হলে সামাজিক অস্থিরতায় রাশ টানা সহজ হবে৷’

মানুষ যত আধুনিকই হোক, জীবনের কোনও এক সন্ধিক্ষণে তাকে থামতে হয়। নিজের জ্ঞান যখন শেষ হয়ে আসে, তখন অন্যের অভিজ্ঞতার দরজা খুলতে হয়। পরিবার চালাতে, সমাজ গড়তে, এমনকি রাষ্ট্রের পথ ঠিক করতেও। বিশ্ব প্রবীণ দিবসে সেই দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার প্রয়োজনীয়তার কথাই বারবার বলে যাচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানের গবেষকরা।

রাতে অফিস থেকে ফিরে বাবার বিছানায় বসেন অবিনাশবাবুর ছেলে সুমিত (নাম পরিবির্তত)। তাঁর ছেলের সিমেস্টারের মার্কশিট বাবার হাতে দেন। বলেন, ‘ওকে ডেকে একটু ম্যাথটা বুঝিও তো মাঝেমধ্যে।’ মুহূর্তেই যেন শিক্ষক অবিনাশবাবু জেগে ওঠেন। কাঁপা হাতটা নেমে আসে ছেলের মাথার ওপর। তাঁর শিরা-ওঠা হাতটা পরম মমতায় বিলি কেটে দিতে লাগে ছেলের চুলে। অবিনাশবাবুর ঘোলাটে চোখ থেকে এক ফোঁটা নোনা জল নিঃশব্দে ঝরে পড়ে সুমিতের চুলে। কোনও উপদেশ নয়, শুধু ওই নীরব, আদিম স্পর্শেই যেন শান্ত হয়ে যায় একটা বিধ্বস্ত মানুষ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *