গৌতম সরকার
ইয়ে ডর মুঝে আচ্ছা লগা… উচ্চারণে আত্মসন্তুষ্টি আসতে পারে। কিন্তু ‘ডর’কে কাজে লাগানো খুব সহজ কথা নয়। যদি না কাজের দিশা, লোকবল ও যথাযথ পরিকল্পনা থাকে। গত দু’মাসের ঘটনাচক্র ও আস্ফালনে স্পষ্ট, বামপন্থা এখন দেশের শাসক শিবিরের নিশানায়। নির্দিষ্ট একটি দল নয়, সার্বিকভাবে সব বামপন্থীরা ‘দিমাগী নকশাল’। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছেন প্রথম।
কিন্তু শাসকের সঙ্গে যুদ্ধে লড়তে বামেরা আদৌ প্রস্তুত কি? সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি, টেলিভিশনের সান্ধ্য শো-তে বামেদের লম্ফঝম্প ইত্যাদি দেখলে, পড়লে বা শুনলে মনে হবে রণসাজ চূড়ান্ত। শুধু নেমে পড়ার অপেক্ষা। বাস্তবে সংশয় অনেক! সিপিএমের একটি সাম্প্রতিক পার্টি চিঠি সংশয়কে আরও উসকে দিয়েছে। এই ধরনের চিঠি বামদলগুলির অভ্যন্তরে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। চিঠি শুধু সংগঠনের অভ্যন্তরের ব্যাপার।
অথচ আমার ৩৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অনেক পার্টি চিঠি ফাঁস হতে দেখেছি। সংবাদমাধ্যমে পার্টি চিঠি নিয়ে বহুবার খবর হয়েছে। আবারও হল। চলতি বছরে সিপিএমের ১ নম্বর পার্টি চিঠি এখন সংবাদমাধ্যমে হাতে হাতে। তাতে বঙ্গ সিপিএমের ঘরোয়া দুর্বলতা, দিশাহীনতা বেআব্রু। যাদের সঙ্গে লড়াই, তার হাঁড়ির খবর পেয়ে গেল প্রতিপক্ষ।
দলের অন্দরের কেউ বা কারা ফাঁস না করলে ঘরের খবরের হাঁড়ি এমন হাটে ভাঙত কি? এমন দুর্বলচিত্ত, দলের প্রতি আনুগত্যহীন, বিশ্বাসঘাতকরা থাকলে লড়াইটা কতদূর এগোবে কমরেড! ভেতরের কী কী খবর বাইরে এল? সবচেয়ে বড় খবর- গোটা চিঠিটার ছত্রে ছত্রে সিপিএমের ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দারের দশা স্পষ্ট। দলের মেদ ঝরেছিল ২০১১-তে বাংলায় ক্ষমতা হারানোর কিছুদিনের মধ্যে। ধান্দাবাজ, সুবিধাবাদীরা কেটে পড়েছিলেন।
মেদ ঝরলে দেহ সুস্থ, সবল হওয়া উচিত। কিন্তু সিপিএমের চেহারাটা যে গত কয়েক বছরে হাড় জিরজিরে, কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছে, তা প্রকাশ করে দিল চলতি বছরে ১ নম্বর পার্টি চিঠি। রাজ্যে দলের ৬৪ শতাংশ শাখায় (বামদলের ভাষায় ব্রাঞ্চ) একজনও ‘এজি’ (অগজিলিয়ারি) মেম্বার নেই এখন। এজি হচ্ছে সিপিএমে সদস্য হওয়ার প্রথম ধাপ। বাম আমলে প্রতিটি ব্রাঞ্চে এজি মেম্বারের সংখ্যা উপচে পড়ত। যাঁরা দলীয় পদ্ধতি অনুযায়ী সদস্যপদ পেতেন।
৬৪ শতাংশ শাখায় এজি নেই মানে সিপিএমের সদস্য হওয়ার আগ্রহ অনেক কম। আবার এও হতে পারে যে, দলে টানার মতো যোগ্য লোক খুঁজে পাচ্ছে না সিপিএম। তাই এজি মেম্বারশিপ দিতে পারছে না কাউকে। ব্রাঞ্চ হচ্ছে বামদলগুলির একেবারে নীচের তলা। যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিবিড় সম্পর্ক থাকার কথা। সেখানে এজি মেম্বার হওয়ার আগ্রহ কম থাকার অর্থ দল রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত।
বৃদ্ধতন্ত্র বামপন্থীদের আরেক ব্যাধি। একসময় ঠাট্টা করে বলা হত দেহত্যাগ পর্যন্ত বামদলে কেউ পদত্যাগ করেন না। সিপিএম শাসনে দাপুটে মন্ত্রী আবদুল রেজ্জাক মোল্লা ‘কালো চুলের তাজা ছেলেদের’ পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। মোল্লা অবশ্য নিজেই বামপন্থা ছেড়ে সুবিধাবাদের আশ্রয় নিয়ে তৃণমূলের মন্ত্রীর পদ বাগিয়েছিলেন। তবে শেষপর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের পদে বয়সের সীমা বেঁধে সিপিএম তরুণ প্রজন্মের ‘এন্ট্রি’র পথ খুলে দিতে চেয়েছিল।
যে নিয়মের কঠোর জালে শিলিগুড়ির অশোক ভট্টাচার্য, প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র, এমনকি বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর মতো আপাদমস্তক কর্মক্ষম নেতাদের সন্ন্যাস নিতে হয়েছে। অথচ সেই শূন্যস্থান পূরণে দলে দলে জেন জেড যে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, তা খোলসা করে দিল পার্টি চিঠিটি। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধর, শতরূপ ঘোষ, সৃজন ভট্টাচার্য, কলতান দাশগুপ্ত, প্রণয় কার্জি প্রমুখ কয়েকটি নাম শুধু ভেসে আছে।
এই নামগুলি নেহাতই খোলস। দলের প্রাণভোমরা নয়। কেন না, পার্টি চিঠিই বলে দিচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম ও সিপিএমের মধ্যে সহস্র যোজন দূরত্ব। ওই চিঠি অনুযায়ী, দলে চলতি বছরে সদস্যদের মধ্যে জেন জেড-এর (৩০ বছরের কম বয়স) হার মাত্র ৪.৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন সদস্যে ৫ জনও বয়সে তরুণ নয়। এজি মেম্বার হওয়ার অনাগ্রহের কারণেই যে সিপিএমে জেন জেড-এর এই হাল, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
এই হালের কারণ বোঝার জন্য গবেষণা জরুরি হলেও সে পথে সিপিএম খুব এগোচ্ছে বলে শুনিনি কখনও। তরুণ প্রজন্মের যে সামান্য সংখ্যক সদস্য আছেন, তাঁদের সিংহভাগের আস্ফালন শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ। আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতায় আসল যুদ্ধ অসম্ভব। অথচ ফেসবুকে যত উপস্থিতি, বুথে তার ২৫ শতাংশ সক্রিয়তা আছে কি না সন্দেহ।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন উপাচার্যহীন। সমস্যায় পঠনপাঠন ও পড়ুয়ারা। সিপিএম বা এসএফআই-এর জোরালো আন্দোলন কই? শুনলাম, মার খাওয়ার ভয়ে পথে নামতে নাকি অনীহা দলের তরুণদের। এমন জেন জেড দিয়ে কোন লড়াইটা হবে কমরেড! অথচ সামগ্রিকভাবে বামপন্থার কাছে এখন বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে দেশের শাসকদলই। বামপন্থীদের কার্যত প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত ও দিমাগী নকশাল উচ্ছেদের নামে বামপন্থা নিধনের আস্ফালন আসলে সেই সুযোগ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তরুণ প্রজন্মের মন থেকে বামমনস্কতা মুছে দিতে একের পর এক আক্রমণ চলছে। শাসক শিবির একতরফা যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে আছে। কোন পথে তার মোকাবিলা- দিশা, পরিকল্পনা, সংগঠন কি আদৌ আছে কমরেড!

