সৌভিক সেন, শিলিগুড়ি: ১৯৯৯। কার্গিলের আকাশে মুহুর্মুহু উড়ছে যুদ্ধবিমান। পাহাড়ের চূড়ায় পাক সেনার অবস্থান লক্ষ্য করে আঘাত হানছে ভারতীয় বায়ুসেনা। স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি আকাশপথে সেই লড়াইয়ের নাম ছিল ‘অপারেশন সফেদ সাগর’। প্রায় তিন দশক পর সেই যুদ্ধই ফিরেছে পর্দায়। তবে এবার বোমা-বারুদের শব্দে নয়, গল্পের ভাষায়। জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়া ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ সিরিজে (Operation Safed Sagar) বাস্তবের সেই অধ্যায়কে তুলে ধরেছেন নির্মাতারা। আর সেই বাস্তব থেকে রিলের সফরে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন দার্জিলিংয়ের ত্রয়ী (Darjeeling)।
একজন পর্দায়। একজন ক্যামেরার পিছনে। আর একজন বাস্তব যুদ্ধের সাক্ষী হিসেবে।
পর্দার ফ্লাইং অফিসার টিকে সিংহের চরিত্রে নজর কেড়েছেন ঘুমের মুখিয়া গ্রামের রাহুল নাওয়াচ মুখিয়া। সিরিজের কাস্টিং ডিরেক্টর শিলিগুড়ির চার্চ রোডের দীপক আগরওয়াল। আর বাস্তবের ‘টিকে সিংহ’- দার্জিলিংয়ের প্রাক্তন বায়ুসেনা আধিকারিক গ্রুপ ক্যাপ্টেন তরুণকুমার সিংহ। ১৯৯৯-এর কার্গিল যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রকের মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর নাম থেকেই সিরিজের চরিত্রটির নামকরণ।
অর্থাৎ, পর্দার চরিত্রের নামের পিছনে বাস্তবের মানুষ। সেই চরিত্রে পাহাড়েরই এক তরুণ অভিনেতা। আর পুরো চরিত্রগুলিকে পর্দায় আনার দায়িত্বে দার্জিলিং জেলারই আরেক তরুণ। ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এর সঙ্গে দার্জিলিংয়ের যোগ তাই নিছক কাকতালীয় নয়।
রাহুলের গল্পটা অবশ্য শুরু হয়েছিল যুদ্ধ দিয়ে নয়, ফুটবল দিয়ে। বিশ্বকাপ এলেই পাহাড়ের অলিগলিজুড়ে উৎসব শুরু হয়। গায়ে জার্সি, হাতে পতাকা, রাত জেগে প্রোজেক্টরে খেলা দেখা- সেই উন্মাদনার মধ্যেই বড় হয়েছেন রাহুল। ম্যাঞ্চেস্টার সিটির গোলকিপার জো হার্টকে দেখে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। দল হিসেবে পছন্দ ছিল বেলজিয়াম। কুয়াশায় মোড়া মুখিয়ার রাস্তায় বেলজিয়ামের জার্সি গায়ে ঘুরে বেড়ানো ছিল তাঁর ছেলেবেলার ছবি। তারপর ফুটবল ছেড়ে ক্যামেরার সামনে।
নর্থ পয়েন্ট স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক। সেন্ট জোসেফ কলেজে মাস কমিউনিকেশন। কোর্সের অংশ হিসেবে ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে সিনেমার প্রতি টান। স্নাতক হওয়ার পর দুই বন্ধুকে নিয়ে মুম্বই পাড়ি। অডিশনে প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাখ্যান। ছ’মাসের মধ্যেই করোনা। লকডাউন। ঘরে ফিরতে হল তাঁকে।
সেই ধাক্কাটাই শেষপর্যন্ত প্রস্তুতির সময় হয়ে উঠল। রাহুল বুঝলেন, বড় পর্দায় কাজ পাওয়ার আগে নিজেকে তৈরি করতে হবে। পাহাড়ে অভিনয় শেখানোর প্রতিষ্ঠান নেই। তাই বই আর আয়নাই হয়ে উঠল শিক্ষক। কনস্টান্টিন স্তানিস্লাভস্কির অ্যান অ্যাক্টরস প্রিপেয়ার্স, স্যানফোর্ড মাইজনারের অভিনয়ের বই পড়ে চলল অনুশীলন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ, শরীরী ভাষা, অভিব্যক্তি- নিজেকে নিজেই তৈরি করলেন।
ফল মিলল। প্রথম ছবি ‘উঁচাই’। অমিতাভ বচ্চন, অনুপম খের, ড্যানি ডেনজংপা, বোমান ইরানির মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ। এরপর ‘বাহাদুর দ্য ব্রেভ’, ‘কাজি’, ‘ক্যায়সি ইয়ে পেহেলি’, ‘শেপ অফ মোমো’। ‘পাতাল লোক’-এ স্থানীয় সাংবাদিক। আর এখন ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এ ফ্লাইং অফিসার টিকে সিংহ।
এই চরিত্রটি তাঁর কাছে একেবারে আলাদা, গর্বেরও বটে।
পুনে থেকে মুঠোফোনে রাহুল বলছিলেন, ‘প্রথম যখন ভারতীয় বায়ুসেনার ইউনিফর্ম পরলাম, চোখে জল এসে গিয়েছিল। খুব বেশি স্ক্রিনটাইম নেই। তবু এই চরিত্রটা এখনও পর্যন্ত আমার কাছে সবচেয়ে দামি।’
সিরিজের জন্য রাত জেগে স্ক্রিপ্ট পড়েছেন, অনুশীলন করেছেন। বায়ুসেনার চারটি এয়ারবেসে হয়েছে শুটিং। বাস্তবের কাছাকাছি যেতে গিয়ে শুটিংয়ের নিয়মও ছিল বাস্তবের মতোই কড়া। এয়ারবেসে ঢোকার আগে মোবাইল সহ ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট জমা রাখতে হয়েছে। ক্যামেরাও পরীক্ষা করে তবেই ঢোকার অনুমতি মিলেছে।
আর এই বাস্তবতার জায়গাটাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তরুণকুমার সিংহ। প্রাক্তন গ্রুপ ক্যাপ্টেন। কার্গিল যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রকের মুখপাত্র। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সিরিজের নির্মাতাদের সাহায্য করেছেন তিনি। ১৯৯৯-এর সেই যুদ্ধকে যাঁরা সামনে থেকে দেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা, বায়ুসেনার কাজকর্ম এবং যুদ্ধের পরিবেশ- সব মিলিয়ে পর্দার গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেই তাঁর পরামর্শ কাজে লেগেছে। তঁার কথায়, ‘ভারতীয় বায়ুসেনার অবদান নিয়ে খুব কম কাজ হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটিতে আবার তথ্যের বিকৃতি হয়েছে। ওনি সেন, কুশল শ্রীবাস্তবের এই কাজ মনে দাগ কাটার মতো। মানুষের সাড়া দেখে মনে হচ্ছে, ২০১৮ থেকে শুরু হওয়া পরিশ্রম সার্থক।’
কিন্তু বাস্তবকে পর্দায় তোলার জন্য শুধু গল্প আর পরামর্শ যথেষ্ট নয়। দরকার সঠিক মুখও। সেই কাজেই দীপক।
শিলিগুড়িতে স্কুল-কলেজের পাঠ শেষ করে দিল্লি গিয়েছিলেন থিয়েটারের টানে। প্রথমে জুনিয়ার আর্টিস্ট, পরে মূল চরিত্রে অভিনয়। অমৃতসর, চণ্ডীগড়, অসম, মেঘালয়, হায়দরাবাদে একের পর এক শো। পরে সিনেমা ও ওয়েব সিরিজে কাস্টিংয়ের কাজ। ‘খউফ’, ‘পাতাল লোক’, ‘জুবিলি’, ‘কিউবিকেলস’ ইত্যাদিতে কাস্টিং অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেছেন। ‘ভেরিয়া’, ‘মুনঝা’-তেও তাঁর কাজের ছাপ রয়েছে। এবার ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এর কাস্টিং ডিরেক্টর।
সিরিজটির প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। নির্মাতা কুশল শ্রীবাস্তব প্রথমে সিনেমা হিসেবে গল্পটি ভাবেন। করোনা এসে থামিয়ে দেয় পরিকল্পনা। পরে সেটিই সিরিজের আকার নেয়। বায়ুসেনার একাধিক আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে, পরামর্শ নিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি হয়। নেটফ্লিক্সের সবুজ সংকেতের পর ২০২৪-এর শেষদিকে শুরু শুটিং। টানা ১১৫ দিন।
দু’বছর ধরে কুশলের সঙ্গে কাজ করেছেন দীপক। তাঁর কথায়, ‘খুব কাছ থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার কাজকর্ম দেখেছি। এয়ারবেসে শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা সারাজীবনের রসদ।’
মুম্বই এখন দীপকের ঠিকানা। রাহুলও কাজের প্রয়োজনে পুনে-মুম্বই ছুটছেন। তরুণ পরিবার নিয়ে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজের কাছেই থাকেন। তিনজনেরই টান পাহাড়ে। দীপক মিস করেন শিলিগুড়ির চেনা গলি, ঘর থেকে দেখা পাহাড় আর ঘরের খাবার। আর টানা কাজের শিডিউল শেষ হলেই মুখিয়ায় মায়ের কাছে ফেরেন রাহুল।
‘অপারেশন সফেদ সাগর’ তাই শুধু কার্গিলের যুদ্ধের গল্প নয়। দার্জিলিংয়ের তিনটি জীবনও যেন এসে মিশেছে সেই আকাশযুদ্ধে। একজন বাস্তবের যুদ্ধকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। একজন সেই গল্পের জন্য মুখ খুঁজেছেন। আর একজন পাহাড় থেকে উঠে এসে সেই গল্পে যুদ্ধবিমান চালিয়েছেন।
রাহুলের একটি কথা তাই হয়তো এই গল্পের শেষ লাইনও হতে পারে- ‘সবকা টাইম আতা হ্যায়।’
মুখিয়ার পাহাড়ি রাস্তা থেকে শুরু করে ‘সফেদ সাগর’-এর আকাশ, রাহুলদের সময়টা বোধহয় সত্যিই এসে গিয়েছে।

