সুকল্যাণ ভট্টাচার্য
নেপালের বিপর্যয় নিয়ে আমরা স্বাভাবিকভাবেই শোকাহত। কিন্তু পাহাড়ের এই বিপর্যয়কে যদি শুধু একটি ভয়াবহ বন্যা, হিমবাহ ধস কিংবা কয়েকশো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে দেখি, তা হলে সবচেয়ে জরুরি শিক্ষাটিই আমরা হারাব। কারণ নেপালের রসুয়ায় যে বিপর্যয় ঘটেছে, তার আসল অভিঘাত একটি নদী দিয়ে মাপা যায় না। পাহাড়ের জল, বরফ, পাথর, মাটি এবং নদীর গতিপথ মিলিয়ে সেখানে যে বিপর্যয়ের জন্ম হয়েছে, সেটি আসলে গোটা হিমালয়ের জন্যই একটি সতর্কবার্তা।
২৬ অগাস্টের সেই ঘটনাপ্রবাহে বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের পরে জল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত পাহাড়ি নদীপথ ধরে নীচে নেমে আসে। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে ত্রিশূলীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এখনও পুরো ঘটনাপ্রবাহ ও তার কারণ বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু এতটুকু স্পষ্ট যে, পাহাড়ে তৈরি হওয়া একটি বিপদ কত দ্রুত নদীপথ ধরে বহু দূরের জনপদে পৌঁছাতে পারে, এই বিপর্যয় তার ভয়াবহ উদাহরণ।
এই ঘটনার দিকে উত্তরবঙ্গের তাকানো উচিত অন্য চোখে। প্রশ্নটি শুধু, নেপালে এমন বিপর্যয় কেন হল, তা নয়। প্রশ্নটি হল, উত্তরবঙ্গের নদীগুলির মাথার দিকে আমরা কী ঘটতে দিচ্ছি এবং নীচের দিকে তার হিসাব কতটা রাখছি?
ভুটানের পাহাড় থেকে নেমে আসা জলঢাকা, রায়ডাক, সংকোশ, কালজানি, গাঠিয়া, ডায়না, মূর্তি, পানা, ডিমা, বসরা, নিমতিঝোরা, হলং সহ অসংখ্য নদী ও ঝোরা উত্তরবঙ্গের জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। নদীগুলির উজান এক দেশে, ভাটির বিস্তীর্ণ অংশ অন্য দেশে হলে নদীকে দুই ভাগে দেখার সুযোগ থাকে না। অথচ আমাদের প্রশাসনিক চিন্তা এখনও অনেকটাই সেই ভাগের মধ্যেই আটকে আছে। নদীকে আমরা জলসম্পদ, সেচ, বিদ্যুৎ, বাঁধ কিংবা বন্যা নিয়ন্ত্রণের আলাদা আলাদা খোপে দেখি। নদী কিন্তু কোনও খোপ মানে না।
এখানেই নেপালের শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস, তার পরে পাথর ও বরফের স্রোত, নদীর গতিপথে সাময়িক বাধা এবং সেই বাধা ভেঙে জল ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নীচে নেমে আসা, সব মিলিয়েই বিপর্যয়টি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বিপর্যয়ের কারণও সরল নয়। একটিমাত্র কারণ দিয়ে হিমালয়ের এমন বিপদকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তাহলে উত্তরবঙ্গের নদীগুলির ক্ষেত্রে আমরা কি এখনও শুধু নদীর নীচের অংশটুকু নিয়েই পরিকল্পনা করছি?
এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। ভারত ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ সহযোগিতার ইতিহাসও দীর্ঘ। ছুখা, কুরিচু, তালা ও মাংদেছুর মতো একাধিক প্রকল্প ইতিমধ্যে দুই দেশের শক্তি সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুনাতসাংছু প্রকল্পগুলির কাজও ভারত-ভুটান সহযোগিতার পরবর্তী অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। সরকারি সূত্রেই এই দীর্ঘস্থায়ী শক্তি সহযোগিতার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব আর নদী অববাহিকার হিসাব এক জিনিস নয়। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত বিদ্যুৎ তৈরি হল, তা দিয়ে মাপা যায় না। তার সঙ্গে দেখতে হয় পাহাড়ের ঢাল, পলির গতি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, ভূমিকম্পের সম্ভাবনা, অতিবৃষ্টি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং আকস্মিক জলস্রোতের ঝুঁকিও। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার নজিরও রয়েছে। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশকে আলাদা খোপে রেখে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বোঝা সম্ভব নয়।
আর এখানেই উত্তরবঙ্গের দুর্বলতা। আমরা নদীকে দেখি যখন নদী ফুলে ওঠে। তখন বাঁধ চাই, স্পার চাই, পাথর চাই, নদীশাসন চাই। কিন্তু নদীর জন্মভূমি থেকে ভাটির জনপদ পর্যন্ত গোটা অববাহিকাকে একসঙ্গে দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়? উত্তরবঙ্গের নদীগুলির সামগ্রিক জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানসম্মত চিত্র সাধারণ মানুষের কাছে তো দূরের কথা, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও কতটা স্পষ্ট, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নদী নিয়ন্ত্রণের অর্থ নদীকে বেঁধে ফেলা নয়। বরং নদী কীভাবে চলে, কোথায় গতি বাড়ায়, কোথায় পলি ফেলে, কোথায় হঠাৎ পথ বদলায়, কোথায় পাহাড়ি জল নেমে এসে মূল নদীর চরিত্র বদলে দেয়, সেই বিজ্ঞান বোঝাই প্রথম কাজ। শুধু চটজলদি কাঠামোগত সমাধান দিয়ে পাহাড়ি নদীর চরিত্রকে সামলানোর চেষ্টা করলে বিপদ বাড়তেই পারে। নদীর জন্য প্রয়োজন নদী-প্রকৌশল, অববাহিকা-ভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করার ব্যবস্থা।
এই জায়গায় উত্তরবঙ্গের আরেকটি ঘাটতি চোখে পড়ে। গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে নদী-প্রকৌশল নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। নদীকে শুধু বন্যার সময়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে সেই শূন্যতা পূরণ হবে না। প্রয়োজন এমন বিশেষজ্ঞ তৈরি করা, যাঁরা নদীকে শুধু জল নয়, একটি চলমান ভূপ্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে বুঝবেন।
সবচেয়ে জরুরি হল ভারত ও ভুটানের মধ্যে নদী নিয়ে আরও কার্যকর যৌথ ব্যবস্থা। আন্তঃসীমান্ত নদী কমিশনের দাবি নতুন নয়। কিন্তু শুধু বৈঠক করলেই হবে না। উজানের বৃষ্টিপাত, নদীর জলস্তর, জলাধারের পরিস্থিতি, ভূমিধস, হিমবাহের পরিবর্তন এবং আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা নিয়ে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা দরকার। উত্তরবঙ্গের নদীগুলির জন্য এমন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার, যার তথ্য প্রশাসন থেকে স্থানীয় মানুষ পর্যন্ত দ্রুত পৌঁছাবে।
নেপালের বিপর্যয় আমাদের সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। একটি নদী যখন ত্রিশূলী হয়ে বয়ে যায়, তার পরে নারায়ণী হয়ে ভারতের দিকে নামে, তখন মানচিত্রের রেখা তার গতিপথ বদলায় না।
তাই নতুন হিমালয়ের সঙ্গে আমাদের পুরোনো চিন্তাভাবনার লড়াই এখনই শুরু করা দরকার। উন্নয়ন বন্ধ করার কথা কেউ বলছে না। প্রশ্ন হল, উন্নয়নের হিসাবের মধ্যে নদী, পাহাড়, বন এবং মানুষের নিরাপত্তাকে কতটা জায়গা দেওয়া হচ্ছে। ভুটানের জলবিদ্যুৎ হোক, উত্তরবঙ্গের সড়ক হোক কিংবা নদীশাসন, প্রতিটি প্রকল্পের আগে দেখতে হবে তার উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত সম্মিলিত প্রভাব।
যে হিমালয়ে হিমবাহের চরিত্র বদলাচ্ছে, পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে এবং নদীর বিপদের ধরন আরও জটিল হয়ে উঠছে, সেখানে পুরোনো নদী ভাবনা দিয়ে ভবিষ্যতের বিপদ সামলানো যাবে না। নতুন হিমালয় আমাদের কাছে নতুন ধরনের জ্ঞান, পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতিও চাইছে।
নেপালের ত্রিশূলী আমাদের কাছে তাই শুধু একটি দূরের নদীর নাম নয়। সেটি যেন আয়না। সেই আয়নায় নিজেদের নদী ব্যবস্থাপনার মুখটাও একবার দেখা দরকার। কারণ বিপর্যয় সব সময় পূর্বাভাস দিয়ে আসে না। কিন্তু বিপদের সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়ার সময় আমাদের হাতে থাকে। সেই সময়টুকু নষ্ট করাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
(লেখক প্রধান শিক্ষক। বানারহাটের বাসিন্দা)

