উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ পাহাড় থেকে নেমে আসা ভয়ঙ্কর কাদার তোড় আর হড়পা বানে একের পর এক ভেসে যাচ্ছে বাস, গাড়ি ও বাড়িঘর (Nepal Flash Flood)। আর এই তাণ্ডবলীলার মাঝে শাশ্বত এক শাড়ির টানই সচল রাখল জীবনের স্পন্দন! চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখেও পরনের শাড়ির সহায়তায় কাঠমান্ডু হয়ে নিরাপদে চেন্নাইয়ে ফিরে এলেন তামিলনাড়ুর ২১ জন পর্যটক। ঘরের মাটিতে পা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একযোগে তাঁরা বলে উঠলেন, ‘‘এ যেন আমাদের নতুন জন্ম।’’
তামিলনাড়ুর একটি পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে কৈলাস মানসরোবর যাত্রায় বেরিয়েছিলেন বেশ কিছু বয়স্ক পর্যটক। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জনের একটি দল বুধবার সকালে তিনটি বাসে সওয়ার হয়ে নেপালের রাসুয়া সীমান্ত হয়ে চিনের অভিবাসন দপ্তরের দিকে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বাসে থাকা ভেলাচেরির বাসিন্দা নবু কবীরদাস এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়া ভুবনেশ্বরী জানান, আচমকাই বাসের চাকা কাদায় আটকে গেলে বিরক্তি তৈরি হয়েছিল। তবে সেই যান্ত্রিক গোলযোগই পরবর্তীতে প্রাণরক্ষক হয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎই বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ করে পাহাড় ধসে কাদামাটির প্রকাণ্ড তোড় নেমে আসতে থাকে। নেপালি বাসচালকের উপস্থিত বুদ্ধিতে যাত্রীরা প্রাণ বাঁচাতে পলায়নের চেষ্টা করেন। তবে ৫০ পেরোনো পর্যটকদের পক্ষে কাদা ঠেলে উঁচু পাহাড়ি টিলায় ওঠা অসম্ভব হয়ে উঠছিল।
ঠিক তখনই ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা। দলের পুনগোড়ি নামে এক মহিলা কোনো মতে একতলা সমান উঁচু একটি মাটির টিলার চূড়ায় উঠে নিজের পরনের শাড়িটি খুলে ঝুলিয়ে দেন নিচে। সেই শাড়ির কাপড় ধরে একে একে টিলার মাথায় চেপে বসেন ২১ জন পর্যটক। সেই শাড়ি ধরেও এক মহিলা কোনও মতেই আর উঠতে পারছিলেন না। বার বার তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন। শেষে তাঁকে কোমড়ে শাড়িটা পেঁচিয়ে নিতে বলা হয়। তিনি শাড়ি কোমড়ে জড়িয়ে নিলে তাঁকে টেনে টিলার উপরে তোলেন বাকিরা। সেখান থেকেই তাঁরা দেখেন তাঁদের ফেলে আসা বাস এবং পেছনের গাড়িগুলি কাদার স্রোতে ৭০ ফুট গভীরে ভেসে যাচ্ছে।
পরবর্তীতে চরম চড়াই-উতরাই ও ৫০ ফুট গভীর খাদ পার করে সেনাশিবিরে আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখানে তাঁদের জল এবং বিস্কুট দেন জওয়ানেরা। তখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, তাঁরা বেঁচে আছেন। কাঞ্চিপুরমের এক স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সত্যা বলেন, ‘‘সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল যেন কোনও ইংরেজি সিনেমা! কাদামাটির উচ্চতা মনে হল যেন ৭০ ফুট।’’
বৃহস্পতিবার প্রায় তিন ঘণ্টা পায়ে হেঁটে একটি হেলিপ্যাডে পৌঁছোন তাঁরা। সেই পথও সহজ ছিল না। কাঁটাঝোপ, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাঁটতে থাকেন তাঁরা। কবীরদাস বলেন, ‘‘সরু পথের একপাশে খাদ। একটু এদিক-ওদিক হলেই ৫০ ফুট গভীর সেই খাদে পড়তে হবে।’’ এক নেপালি ব্যক্তি তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন হেলিপ্যাডে। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাঁদের নিয়ে যাওয়ার হয় কাঠমান্ডু। তার পর পৌঁছোন দিল্লি। তার পরে শুক্রবার পৌঁছে যান চেন্নাই। এখনও তামিলনাড়ুর বহু পর্যটক নেপালে নিখোঁজ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্ধারকাজে যুক্ত আধিকারিকেরা।

