সোমনাথ দত্ত, মালবাজার: কঠোর পরিশ্রমে সবুজ প্রকৃতিতে গরুবাথান (Gorubathan) পাহাড়ে অর্থনীতির নতুন পাঠ লাঙলের ফলায়। প্রথাগত কৃষিকাজ এবং পশুপালনকে ভিত্তি করে যে গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল, তাতে এখন বইছে আধুনিক পরিবর্তনের হাওয়া। সাম্প্রতিককালে রাসায়নিকমুক্ত জৈব বা অর্গানিক চাষাবাদের (Natural farming) দিকে ঝুঁকেছেন এলাকার কৃষকরা। ফলে এলাকার অর্থনীতির চেহারায় আমূল পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে।
অনুকূল আবহাওয়ায় পাহাড়ি ঢালের উর্বর মাটিকে কাজে লাগিয়ে এলাচ, হলুদ, আদা, স্কোয়াশ, আপেল, লেবু, কমলালেবু, কুমির নাসপাতি বা মাখনফল, কিউয়ির মধ্যে যে গুণগত পরিবর্তন এনেছেন স্থানীয় কৃষকরা, তা এখন দেশ-বিদেশে প্রশংসিত। চাহিদা বৃদ্ধিতে বাড়ছে রোজগার। কমলালেবু ও স্কোয়াশের মতো ফলমূলের পাশাপাশি অর্গানিক চা চাষ তাঁদের বাড়তি লাভের মুখ দেখাচ্ছে বলে অকপটে জানাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষির এই জোয়ারকে আরও মজবুত করেছে এখানকার পশুপালন ব্যবস্থা। প্রতিটি পরিবারেই কৃষিকাজের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করা হয়। গরুবাথান ব্লকের অন্তর্গত নিম, তোদে, তাংতা, সামসিং, কুমাই, গরুবাথান-১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে গ্রামীণ অর্থনীতির দৈনিক আয়ের একটি স্থায়ী উৎস তৈরি করেছে।
সঞ্জ যোগী, পূজান তামাং, হুসেন রাই, সাজু রাইদের মতো কৃষকদের বক্তব্য, জৈবিক উপায়ে উৎপাদিত ফসল ও ফলের বাজারজাত চাহিদা রয়েছে প্রচুর। উৎপাদিত ফসল স্থানীয় সোমবাড়ি বাজার, শিলিগুড়ি, কালিম্পং ছাড়াও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়দায় বাজারজাত হয়েছে। সুভাষ তামাং বললেন, ‘সরকারি-বেসরকারি স্তরে সঠিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে আগামীতে এলাকার সবুজ অর্থনীতি আরও সুদূরপ্রসারী হবে।’ গরুবাথান ব্লক কৃষি দপ্তরের উদ্যোগে কৃষকদের জৈবিক চাষাবাদের উন্নতিতে এবং পরম্পরাগত কৃষি বিকাশের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। যদিও স্থানীয় স্তরে কৃষকদের উন্নতিতে সরকারি সহযোগিতার দাবিও রয়েছে। বীরেন তামাং মনে করেন, ‘অর্থনৈতিক বিকাশে কৃষিকাজ ও পশুপালন যুক্ত। সরকারিভাবে আরও উদ্যোগ নেওয়া হলে এলাকার কৃষির আরও ব্যাপ্তি ঘটবে।’
স্থানীয় মান্ডিতে প্রতি কেজি জৈবিক আদা ১০০ টাকা, হলুদ ১০০-২০০ টাকা, শুকনো এলাচ ১৪০০-১৫০০ টাকা কেজিপ্রতি বিক্রি করে থাকেন স্থানীয় কৃষকরা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ততটা উন্নত না হওয়ায় শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বাজারগুলিতে জৈবিক ফসল নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষকদের সমস্যায় পড়তে হয়। এতে লভ্যাংশের পরিমাণও কমে। সন্দীপ রাই বলেন, ‘স্থানীয় আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সঠিক অর্গানিক প্রিমিয়াম বা বাড়তি মূল্য থেকে ক্রমশ বঞ্চিত হতে হচ্ছে। অর্গানিক সার্টিফিকেশনের অভাবেও উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য বাজারজাত করতে সমস্যা হয়।’ বড় শহরগুলির বাজারে দ্রুত এবং সহজে জৈবিক কৃষিজ পণ্য নিয়ে যেতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দাম অনেকাংশেই বৃদ্ধি পাবে। সঞ্জ যোগী বলেন, ‘জৈবিক উপায়ে উৎপাদিত ফসল এবং ফলের বাজার যথেষ্ট ভালো। যে কারণে বিক্রি হতে বেশি সময় লাগে না।’ বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য থাকলে আরও লাভ ঘরে তোলা যাবে বলে মনে করেন কৃষকরা।

