রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার: মুখোশের অবয়বে কখনও ফুটে ওঠে দেবতার মহিমা, কখনও অসুরের আস্ফালন। কখনও বা সেই মুখোশের শরীরী ভাষায় কথা বলে ওঠে এক জনপদের ইতিহাস, বিশ্বাস আর জীবনযাপনের কাহিনী। বাংলার লোকসংস্কৃতির এমনই দুই স্বতন্ত্র অথচ মাটির সুরে বাঁধা শিল্পধারা পুরুলিয়ার ছৌ এবং দিনাজপুরের গমীরা। ইটাহারের (Itahar) ঝাড়কালি গ্রামের পুকুরপাড়ে গ্রাম ঠাকুরের থান। সেখানেই প্রাচীন বট গাছতলে মহড়া কষেন গমীরা দলের রাজবংশী শিল্পীরা। সোম ও মঙ্গলবার এই বটশাখার চাঁদোয়াতলই হয়ে উঠল দুই প্রাচীন লোকসংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। পুরুলিয়া থেকে এসেছিলেন ছৌ শিল্পী সুরেশ, মানস, সুনীল ও গণেশ মাহাতোরা। তাঁদের সঙ্গ দিলেন দিনাজপুরের গমীরা শিল্পী আসারু, অজয়, প্রদীপ ও অজিত সরকাররা। খোলা আকাশের নীচে তালে-ছন্দে মিলেমিশে একাকার হল রাঢ়বঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের দুই সংস্কৃতির নৃত্যধারা।
দুই শিল্পের জন্মভূমি আলাদা। পরিবেশনার ভাষাও ভিন্ন। ছৌয়ের শরীরী ব্যাকরণে রয়েছে পৌরুষের দৃপ্ত প্রকাশ, ক্ষিপ্রতা, লম্ফন, ঘূর্ণি আর ছন্দের দুরন্ত বিস্তার। অন্যদিকে দিনাজপুরের গমীরা নাচে মুখোশের অভিব্যক্তি, লোকবিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং নিজস্ব ভঙ্গিমায় ফুটে ওঠে উত্তরবঙ্গের মাটির নিজস্ব জীবনবোধ। ছৌয়ের প্রতিটি পদক্ষেপে যেমন ধরা পড়ে যুদ্ধ ও পৌরাণিক আখ্যানের নাটকীয়তা, তেমনই গমীরার মুখোশে মিশে থাকে লোকদেবতা, প্রকৃতি ও গ্রামীণ জনজীবনের নানা অনুষঙ্গ। মুদ্রা, বিভঙ্গ, ছন্দ, ভঙ্গিমা থেকে শুরু করে শিল্পের চরিত্র কিংবা চিত্রনাট্য— প্রায় সবদিক থেকেই দুই শিল্পের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। তবু কোথাও যেন তারা একে অপরের আত্মীয়। কারণ, দুইয়েরই শিকড় প্রোথিত রয়েছে মাটির গভীরে। দুটি শিল্পই আসলে আবহমানকাল ধরে লোকজীবনের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বাহক। সময়ের প্রবাহে বদলেছে পরিবেশ, বদলেছে দর্শকের রুচি। কিন্তু মুখোশের আড়ালে বেঁচে রয়েছে সেই আদি লোকায়ত চেতনা।
এই শিকড়ের টানকেই আরও নিবিড় করে তুলতে উত্তরবঙ্গ সংস্কার ভারতী নাট্যবিধার উদ্যোগে এবং দিনাজপুর গমীরা মুখা অ্যাকাডেমি (মাঙ্গলিকা)-এর ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত হল দু’দিনব্যাপী মুখোশ নাট্য কর্মশালা। মাঙ্গলিকার কর্ণধার অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘পুরুলিয়ার (Purulia) ছৌ এবং দিনাজপুরের গমীরাকে কাছাকাছি এনে দুই শিল্পধারার মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের এক নতুন পরিসর তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল ভাবনা।’

