অরিন্দম বাগ ও কল্লোল মজুমদার, ভূতনি: সন্ধে ৬টা। মালদার (Malda) ভূতনি (Bhutni) সেতু সংলগ্ন ঘাট থেকে যাত্রীবাহী শেষ সরকারি নৌকাটিও ছেড়ে গেল। সরকারিভাবে শেষ নৌকার সময় অবশ্য বিকেল ৫টা। তবে কিছু লোক থেকে যায় প্রতিদিনই। প্রতিদিনই দেরি হয়। ততক্ষণে সূর্য অস্ত গিয়েছে। আকাশে শুধু সামান্য আলোর রেশ। জলের মধ্যে আরও একটু এগোতেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল।
মাঝিরা অন্ধকারেও দিক বুঝতে পারেন অভিজ্ঞতায়। তবে সাধারণ মানুষের মনে শুধুই ভয়। ভরসা কেবল গুগল ম্যাপ আর টর্চের আলো। প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ পর হঠাৎ সামনে থেকে টর্চের আলো ক্রমাগত জ্বলতে-নিভতে দেখা গেল। সামনের আরেকটা নৌকা থেকেও একই ধরনের সিগন্যাল আসছে। বোঝা গেল, ওই দিকেই যেতে হবে। খানিক সময় পর আলাদিয়া গ্রামের কাছে পৌঁছাল নৌকা।
গ্রামের প্রায় দেড়শো মিটার দূর থেকেই কোলাহলের শব্দ কানে ভেসে আসছে। ধীরে ধীরে গ্রামে ঢুকছে নৌকা। একের পর এক বাড়ি জলমগ্ন। কোনও লোকজন নেই। অন্ধকারে সবই যেন পরিত্যক্ত ভূতুড়ে বাড়ি মনে হচ্ছে। শেষে বাঁধে এসে পৌঁছাল নৌকা। এই জায়গায় সেই কোলাহলের উৎসস্থল। বাঁধে উঠতেই দেখা গেল, একদিকে পরপর গবাদিপশু বাঁধা। মশার দাপট থেকে বাঁচতে গবাদিপশুদের পাশে খড় দিয়ে ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, পরপর অস্থায়ী ঘর। বাঁশের মাচা, সরকারি ত্রিপল আর খড় দিয়ে তৈরি সেই সমস্ত অস্থায়ী ঠিকানা। কমবেশি প্রতিটি ঘরে একটি করে ছোট্ট টিমটিমে আলো। কোনও ঘরে মশারি রয়েছে, কোথাও নেই।
রাত নামলেই ভূতনিতে নেমে আসছে ভয়। আতঙ্কের কারণ বন্যার জল আর নিকষ কালো অন্ধকার। সূর্য ডুবলেই বিদ্যুৎহীন ভূতনি যেন পরিণত হচ্ছে এক অচেনা ভূতপুরীতে। চারদিকে শুধু জল আর জল। তার মাঝেই কোনওরকমে রাত কাটাচ্ছেন হাজার হাজার জলবন্দি মানুষ। দিনের আলোয় তা-ও তো বোঝা যায়, চারপাশে মানুষজন রয়েছে। কেউ বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ আবার ঘরের মধ্যেই মাচা তৈরি করে কোনওরকমে দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় গোটা ছবি। শংকরটোলা, ভুবনটোলা, ডোমনটোলা সহ বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যায় নিকষ কালো অন্ধকারে।
বন্যার জল ঢুকে পড়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন। ফলে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জলবন্দি গ্রামগুলিকে গ্রাস করছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাতে টর্চ কিংবা মোবাইলের আলোই তখন একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই সামান্য আলো দিয়ে চারপাশের বিপদ কতটা ঠেকানো সম্ভব, তা নিয়েই আতঙ্কে বাসিন্দারা। প্রবীণ সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, ‘এখানে কোনও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। রাতে আমাদের ভরসা ব্যাটারিচালিত ইমার্জেন্সি লাইট। তবে রাতের অন্ধকারে সাপ নিয়ে আমাদের আরও বেশি ভয়। যে কোনও সময় যে কোনও ঘরে সাপ ঢুকে যেতে পারে। রাতে কাউকে সাপ কামড়ালে আমাদের কিছুই করার থাকবে না। এই অন্ধকারে স্পিডবোট আসতেই অনেকটা সময় লেগে যাবে। আর গভীর রাতে এই ঘটনা ঘটলে, সব ভগবানের ভরসায়। আর কত দিন আমাদের এই যন্ত্রণায় থাকতে হবে, জানি না।’
চারদিকে জল। কোথাও উঠোন দেখা যাচ্ছে না, কোথাও রাস্তার অস্তিত্ব নেই। দিনেরবেলাতেই নৌকা ছাড়া যাতায়াত কার্যত অসম্ভব। আর রাতের অন্ধকারে সেই জল যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। কোথায় কতটা গভীর জল, কোথায় গর্ত কিংবা কোথায় স্রোত- অন্ধকারে বোঝার কোনও উপায় নেই। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছোট ছোট শিশুকে নিয়ে থাকা পরিবারগুলি। একটু অসতর্ক হলেই ঘটে যেতে পারে বড়সড়ো দুর্ঘটনা। তাই রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চাইছেন না মায়েরা। কেউ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকছেন মাচার ওপরেই, কেউ আবার ছাদে রাত কাটাচ্ছেন। ডোমনটোলার বাসন্তী মণ্ডল স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নিজেদের বাড়ির ন্যাড়া ছাদে। খোলা ছাদে কালো পলিথিন টানিয়ে বানিয়েছিলেন দু’খানা ঘর। আপাতত সেখানেই তাঁর সংসার। বাসন্তী বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে। একজনের বয়স দুই, একজনের চার। তাই সবসময় ভয় হয় ছাদ থেকে জলে পড়ে না যায়। আর রাত হলে ওদের এক নিমেষের জন্যও চোখের আড়াল করি না।’
কেশরপুর ঘাটে বাঁধের ওপর দেখা হল সমিরুদ্দিনটোলার বাসিন্দা শেখ রাজুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সূর্য ডোবার পর বাড়ির বাইরে বের হলে ভরসা মোবাইলের আলো। তাই প্রতিদিন বাড়ির সবার মোবাইল চার্জ করতে যাচ্ছি মথুরাপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে।’
রাতের অন্ধকারে একটু দূরে কোথাও হয়তো জল ঠেলে নৌকা চলে যাওয়ার শব্দ। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে বাঁশ, খড় আর ত্রিপল জোড়া দিয়ে বানানো অস্থায়ী আশ্রয়গুলিতে জেগে থাকে মানুষ। ঘুমিয়ে পড়ার মতো নিশ্চিন্ত রাত এখানে নেই। আছে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকা, অপেক্ষা আর যতটা সম্ভব শুকনো জায়গাটুকু আগলে রাখার চেষ্টা।

