পুজো মানেই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া, ঠাকুর দেখা, আড্ডা আর শেষে পছন্দের রেস্তোরাঁয় জমিয়ে খাওয়া। মালদার তরুণদের অনেকের কাছে পুজোর এই অভ্যাসটা প্রায় নিয়মের মতো। কিন্তু খাদ্য দপ্তরের লাগাতার অভিযানের পর এবার সেই অভ্যাসে যেন একটু থমকে যাওয়ার পালা।
অরিন্দম বাগ, মালদা: পুজো (Durga Puja) আসছে। শহরের রাস্তায় ধীরে ধীরে উৎসবের গন্ধ। হাতে আর মাত্র মাসখানেক। তার আগেই হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে বসে তৈরি হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। কোন দিন কোন ঠাকুর দেখা হবে, কোথায় আড্ডা জমবে, আর তার পরে কোথায় গিয়ে পছন্দের খাবারে ভাগ বসানো হবে- পুজোর এই হিসাবও তো বাঙালির উৎসবেরই অঙ্গ। কিন্তু এবার সেই হিসাবের খাতায় যেন একটা প্রশ্নচিহ্ন ঢুকে পড়েছে। রেস্তোরাঁয় গিয়ে পছন্দের খাবার অর্ডার করার আগে খাবারটা (Meals Security) কতটা নিরাপদ, সেই ভাবনাটাও কি করতে হবে?
মালদা (Malda) শহর ও জেলার বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং খাদ্যসামগ্রীর দোকানে গত সপ্তাহখানেক ধরে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অভিযানে উঠে এসেছে নানা অনিয়মের ছবি। কোথাও ২০-২৫ দিনের পুরোনো মাছ-মাংস মজুত করে রাখার অভিযোগ উঠেছে, কোথাও মাত্রাতিরিক্ত ফুড কালার ব্যবহারের প্রবণতা সামনে এসেছে। আবার কোথাও রান্নার জায়গার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানের পর সেইসব ছবি সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। সেইসব খবর ও পোস্টের তলায় আমআদমির ভূরিভূরি মন্তব্যও নজরে এসেছে। আর তারপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পুজোর সময়ে বাইরে খাওয়ার অভ্যাসে কি এবার কিছুটা বদল আসবে? আর তাতে কি মালদার হোটেল ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ পড়বে?
পুজোর সঙ্গে বাঙালির খাওয়াদাওয়ার সম্পর্কটা কেবল পেট ভরানোর নয়। সারা বছর ব্যস্ততার মধ্যে যে বন্ধুরা একসঙ্গে বসার সময় পান না, পুজোর কয়েকটা দিন তাঁদের সেই সুযোগ করে দেয়। ঠাকুর দেখার ফাঁকে রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়া, এক টেবিলে অনেকগুলো খাবার সাজিয়ে নেওয়া, খেতে খেতে গল্প- উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে এই ছোট ছোট মুহূর্তও। মালদার তরুণদের একাংশের কাছে সেই অভ্যাসে এবার একটু সংশয়। মালদা শহরের তরুণ শুভম মণ্ডল যেমন এ বছর রেস্তোরাঁ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শুধু পুজোর দিনগুলোতেই তো বন্ধুরা একসঙ্গে হওয়ার সুযোগ পাই। প্রতিবছরই পুজোর দিনগুলোতে রেস্তোরাঁয় জমিয়ে খাওয়া আর আড্ডা চলতে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানে রেস্তোরাঁগুলোর যে ছবি উঠে এসেছে, তাতে আমরা রেস্তোরাঁ থেকে দূরে থাকব বলেই আপাতত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মালদা শহরের আর এক তরুণেরও একই কথা। তাঁর আবার পুজোর সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে পানীয়ের সঙ্গে চিকেন বা মাটনের বিভিন্ন পদ খাওয়ার পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানের পর ননভেজ খাবার নিয়ে তাঁরা সতর্ক হতে চাইছেন।
তবে শুভমদের মতো ভাবনা সকলের নয়। বিরিয়ানি-ফ্রায়েড রাইস-চিলি চিকেন-রোল-চাউমিনের মতো সুখাদ্যের টেবিল থেকে একেবারে দূরে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন না অনিকেত সরকার। বরং তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে একটু অন্য হিসাব। তিনি বলেন, ‘পুজোয় রেস্তোরাঁয় না খেলে কি চলে? খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানে পচা মাছ-মাংস ধরা পড়ার খবর শুনেছি। তাই আমরা ঠিক করেছি, নবমীর পর থেকে রেস্তোরাঁয় যাব।’ কেন? তাঁর যুক্তি, ‘প্রথম দু-তিনদিনে রেস্তোরাঁয় মজুত থাকা মাছ-মাংস সব বিক্রি হয়ে যাবে। শেষের দিকে গেলে তাই আমরা টাটকাটাই পাব।’
তরুণদের এই সংশয়ের জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি জয়ন্ত কুণ্ডু বলেন, ‘পুজোর আগে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। মানুষের স্বাস্থ্য সবার আগে। পুজোয় প্রায় সকলেই কমবেশি খাওয়াদাওয়া করেন। এই সময়ের আগে ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে হবে।’ তাঁর আরও দাবি, খাবার সংরক্ষণ এবং ফুড কালার ব্যবহারের মতো বিষয়ে প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন। জয়ন্ত কুণ্ডু বলেন, ‘কত দিন পর্যন্ত ফ্রিজে মাছ-মাংস মজুত করা যাবে, খাবার তৈরিতে কি ফুড কালার ব্যবহার করা যাবে- এসব নিয়ে প্রশাসন নির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করে ব্যবসায়ীদের সচেতন করুক।’
পুজো যত এগিয়ে আসবে, শহরের রেস্তোরাঁগুলিও নিশ্চয়ই জমজমাট হবে। লোকজন আবার এক টেবিলে বসবেন, মেনু হাতে খাবার বাছবেন, গল্পে-আড্ডায় সময় গড়িয়ে যাবে। কিন্তু এবার মেনু বাছাইয়ে থাকবে একটু বেশি সচেতন চোখ। কারণ উৎসবের আনন্দে পেটপুজো বাঙালির কাছে যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি খাবারের মান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকাটাও।

