কল্লোল মজুমদার, মালদা: নীল-সাদা রংয়ের ঝাঁ চকচকে চারতলা ভবন। যার গায়ে বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে, ‘রাত্রিনিবাস’। সেইসঙ্গে লেখা রয়েছে ‘রোগীর পরিজনদের জন্য’। কিন্তু, সেই ভবন কয়েক বছর হল গড়ে উঠলেও এখনও খুলে দেওয়া হয়নি রোগীর পরিজনদের জন্য। তাই বাধ্য হয়েই রোগীর পরিজনদের কেউ ট্রমা কেয়ার ইউনিটের বারান্দায়, কেউবা মাতৃমার সামনে শেডের তলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রতিদিন। যে কোনওদিন গেলেই দেখা যাবে, কয়েকশো মানুষ মাটিতে প্লাস্টিক বিছিয়ে, মশারি টাঙিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউবা আশ্রয় নিয়েছেন আউটডোরের বাইরে নর্দমার ধারে। অথচ বিপুল অর্থ খরচ করে মালদা মেডিকেলে গড়ে ওঠা ‘রাত্রিনিবাস’-এর শোভা বাড়াচ্ছে তার গেটে ঝুলতে থাকা তালা। কেন ঝুলছে তালা সে প্রশ্নের উত্তরে মালদা মেডিকেল কলেজের (Malda) অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আমরা খুব শীঘ্রই রাত্রি ভবন একটি সংস্থার হাতে তুলে দেব।’
শুক্রবার সকাল আটটা। মালদা মেডিকেল কলেজ চত্বরে মা ক্যান্টিনের পাশে নির্মিত সেই রাত্রিনিবাসের বারান্দায় দেখা গেল এক মহিলা বসে রয়েছেন। সঙ্গে রয়েছেন তাঁর দুই আত্মীয়। তাঁদের মধ্যে একজন আবার বৃদ্ধ। কথা বলতে গিয়ে জানা গেল, রমা মণ্ডল নামের ওই মহিলা এসেছেন ইংরেজবাজারের সাট্টারি এলাকা থেকে। তাঁর স্বামী ভর্তি রয়েছেন মেল মেডিকেল ওয়ার্ডে। তাই তিনি রাতভর ঠাঁই নিয়েছিলেন রাত্রিনিবাসের বারান্দায়। প্রশ্নের উত্তরে রমা বলেন, ‘রাতে ঠান্ডায় খুব কষ্ট হয়েছিল। সঙ্গে বয়স্ক শ্বশুর ছিলেন। সকলেরই খুব কষ্ট হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের বাইরে হোটেল ভাড়া করে থাকার ক্ষমতা আমাদের নেই।’
আবার মাতৃমার সামনে রোগীদের পরিজনদের অপেক্ষার জায়গায় রাতভর কেটেছে কালিয়াচকের আব্দুস সামাদ, রাহুল শেখ এবং মোথাবাড়ির শুভ্র মণ্ডলদের। সকলেরই এক দাবি, যত দ্রুত সম্ভব খুলে দেওয়া হোক রাত্রিনিবাস। রাহুল শেখের কথায়, ‘মালদায় মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে খুব ভালো কথা। কিন্তু এখনও পরিকাঠামো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। রাত্রিনিবাস যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি হাসপাতাল চত্বরে থাকা পানীয় জলাধার নিয়মিত পরিষ্কার করা। অত্যন্ত নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে জলাধারগুলির পাশে।’ এজন্য সাধারণ মানুষকে যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি নিয়মিত দেখভালের ব্যবস্থা করতে হবে মেডিকেল প্রশাসনকে। বিষয়টি দেখা উচিত রোগীকল্যাণ সমিতির কর্মকর্তাদের বলে তিনি মনে করেন।
শুভ্র মণ্ডলের কথায়, ‘আউটডোরের পাশে একটা জায়গায় সারারাত আশ্রয় নিয়েছিলাম। রাতে মালদার তাপমাত্রা ভীষণ কমে গিয়েছিল। প্রচণ্ড শীত করছিল। তার মধ্যে মশার কামড়। বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে একটা মশারি কিনতে হয়েছে। কোনওরকমে রাত কাটিয়েছি। যেখানে শুয়েছিলাম ঠিক তার পাশে একটা নর্দমা রয়েছে। কিন্তু কিছু উপায় ছিল না। বাধ্য হয়েই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাত কাটিয়েছি। কবে যে রাত্রিনিবাস খোলা হবে’, প্রশ্ন তাঁর।
মালদা মেডিকেল নিয়ে অভাব অভিযোগের পাহাড় জমে উঠেছে। এবার প্রশ্ন, সেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবে কে?
