কল্লোল মজুমদার, মালদা: মালদা শহরের (Malda) লালপরিপাড়ার ছোট্ট বাড়িটায় এখন কার্যত উৎসবের ব্যস্ততা। আর মাত্র কয়েক দিন পর রথযাত্রা। ঘরের এক কোণে সারি সারি শুকিয়ে রাখা মাটির পুতুল, অন্য কোণে তুলি হাতে রঙের শেষ ছোঁয়া দিচ্ছেন অঞ্জন পণ্ডিত। পাশে বসা মা সুদামা পণ্ডিতের বয়স আশি ছুঁইছুঁই হলেও সমানতালে সাহায্য করছেন ছেলেকে।
ছোটবেলা থেকে রথের মেলায় মাটির পুতুল বিক্রি করে আসছেন অঞ্জন। তাঁর হাতে তৈরি জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা, মাথা নাড়ানো বুড়ো, ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধরত সৈনিক, আম বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতা, সাপুড়ে- প্রতিটি পুতুল যেন গ্রামবাংলার গল্প বলে। দামও সাধ্যের মধ্যে, ২৫ টাকা থেকে বড়জোর ১০০ টাকা। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নিয়েছে বার্বি, সিন্ডারেলা, বেল বা এরিয়েলের মতো বিদেশি ডল। মাটির পুতুল এখন যেন শুধুই রথের মেলার স্মৃতি। তবু আশা ছাড়েননি অঞ্জন। প্রতি বছর নতুন উদ্যমে তিনি তৈরি করেন শত-শত পুতুল। তাঁর বিশ্বাস, রথের মেলায় এখনও এমন কিছু মানুষ আসেন, যাঁরা মাটির গন্ধে শৈশব খুঁজে পান।
রঙে ভেজা হাত মুছতে মুছতে অঞ্জনের কণ্ঠে ফুটে ওঠে আক্ষেপ, ‘হারিয়ে যাচ্ছে পুতুল, হারিয়ে যাচ্ছে ছেলেমেয়েদের শৈশব। এখন তাদের সময় কাটে শুধু মোবাইলের পর্দায়। মাটির পুতুল হাতে নিয়ে গল্প বানানোর দিন যেন ফুরিয়ে এসেছে।’ তবু রথের মেলা এলেই তাঁর বাড়িতে আবার জেগে ওঠে আশা, হয়তো কোনও ছোট্ট হাত আবারও বেছে নেবে একখানা মাটির পুতুল, আর সেই পুতুলের সঙ্গেই ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের এক টুকরো রঙিন স্মৃতি।
মালদা শহরের প্রাচীনতম মকদুমপুরের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে বিশাল মেলা বসে। এলআইসি মোড় থেকে গৌড় রোড পর্যন্ত দীর্ঘ পথের দু’ধারে বসে সারি সারি দোকান। চলে কেনাবেচাও। বহু বছর ধরে মেলার দিন রথঘর থেকে ঠিক একটু এগিয়ে রাস্তায় কাঠের চৌকির উপর পুতুল সাজিয়ে বসেন অঞ্জন। তাঁর কথায়, ‘মালদা শহরে মাটির পুতুল তৈরি করার শিল্পী আর কেউই নেই। আমি, আমার মা আর স্ত্রী এই তিনজন মিলে রথের সময় আর জন্মাষ্টমীর সময় পুতুল তৈরি করি।’
রথের মেলায় পুতুল বিক্রি করেন আরও এক বিক্রেতা রতন পাল। প্রশ্ন করতেই তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি মূলত কৃষ্ণনগর আর চাকদা থেকে পুতুল কিনে এনে বিক্রি করি। তবে এখন মাটির পুতুলের চাহিদা খুবই কমে গিয়েছে। এখন তো সবাই বার্বি, সিন্ডারেলার দিকে ঝুঁকছে। এখন আর কেউ পুতুল নিয়ে খেলে না, যারা কেনে তারা নেয় ঘর সাজানোর জন্য। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের খেলা মানে মোবাইলে গেম আর রিলস দেখা।’

