ঢাকা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কোন পথে চলেছে বাংলাদেশ? ভারতের প্রতিবেশী দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রতিদিন নতুন জল্পনার জন্ম দিচ্ছে। তবে পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের মতে, মাঠময়দানে আওয়ামি লিগের অনুপস্থিতির সুযোগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জটিলতা বাড়াচ্ছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র নেতাদের একাংশের ‘অতিসক্রিয়তা’। যাঁদের অনেকেই এখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র ছাতার তলায় রয়েছেন। এনসিপি নেতা হাসনত আবদুল্লা, নাহিদ ইসলামদের একের পর এক বয়ান শুধু অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলছে না, বিএনপি-জামাতের মধ্যে বিরোধকে তীব্রতর করেছে। মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ছাত্র নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ফাটলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। এদিকে দেশজোড়া বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় সক্রিয়তা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনা।
বাংলাদেশের একাধিক সূত্রে দাবি, রাজধানী ঢাকায় ছাত্র ও মৌলবাদীদের বিক্ষোভ, গণ্ডগোল ঠেকাতে সেনার প্রচুর সাঁজোয়া গাড়ি ও বাড়তি বাহিনী তলব করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। পুলিশকেও সতর্ক করা হয়েছে। এর জেরে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা জোরালো হয়েছে বাংলাদেশে। যদিও সেনাবাহিনী এবং দেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলি এ ব্যাপারে নীরব। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেনা সক্রিয়তা নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনার সাভার ভিত্তিক নবম ডিভিশনের সেনা ইউনিটগুলিকে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে গোটা ডিভিশন ঢাকার উদ্দেশে মার্চ করবে।
টানাপোড়েনের সূত্রপাত বৃহস্পতিবার রাতে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনত আবদুল্লার একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আওয়ামি লিগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দিতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে সেনাবাহিনী। এজন্য ১১ মার্চ তাঁকে এবং আরও কয়েকজনকে সেনা ক্যান্টনমেন্টে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। ওই বৈঠকে নাকি আসন সমঝোতার ভিত্তিতে আওয়ামি লিগকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন সেখানে উপস্থিত সেনাকর্তারা। হাসনত লেখেন, ‘আওয়ামি লিগকে ফেরানোর পরিকল্পনা চলছে। ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামি লিগ নামে নতুন একটি ‘ট্যাবলেট’ নিয়ে শীঘ্রই হাজির হবে।’ অপর একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ড. ইউনূস, আওয়ামি লিগ ৫ অগাস্ট নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। উত্তরপাড়া ও ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামি লিগের চ্যাপ্টার ওপেন করার চেষ্টা করে লাভ নেই।’ উত্তরপাড়া বলতে বাংলাদেশে ঢাকার সেনা ক্যান্টনমেন্টকে বোঝায়।
তাঁর বক্তব্যের রেশ ধরে এনসিপির আহ্বায়ক তথা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়া অসমাপ্ত রেখে আওয়ামি লিগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার যে কোনও ধরনের আলোচনা ও প্রস্তাব এনসিপি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামি লিগের বিচার চলাকালীন আওয়ামি লিগ এবং ফ্যাসিবাদের সকল সহযোগী ব্যক্তি ও সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।’
সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠান ও সাক্ষাৎকারে আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ না করার পক্ষে সওয়াল করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর কথায়, ‘কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনও উপায় নাই। কিন্তু যে অন্যায় করেছে, তার বিচার হওয়া উচিত।’ বৃহস্পতিবার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করার কোনও পরিকল্পনা নেই অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু যাঁরা হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত দেশের আদালতে তাঁদের বিচার করা হবে।’ ইউনূসের বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন হাসনত ও নাহিদ।
এদিকে গণহত্যায় অভিযুক্ত লিগ নেতাদের বিচারের পক্ষে সওয়াল করলেও বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভি বলেন, ‘গণহত্যা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নন, এমন কারও নেতৃত্বে আওয়ামি লিগের রাজনীতিতে কোনও বাধা নেই।’ তাঁর মন্তব্যের বিরোধিতা করে জামাত-ই-ইসলামির আমির শফিকুর রহমান সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আওয়ামি লিগের পুনর্বাসন জনগণ মেনে নেবে না।’ সরকার, রাজনৈতিক দল ও সেনার টানাপোড়েনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে এগোয় এখন সেদিকেই তাকিয়ে সব মহল।
