সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, ডালাস: নিউ জার্সি থেকে নর্থ ক্যারোলিনার শার্লট হয়ে যখন ডালাসের মাটিতে পা রাখলাম, তখন টেক্সাসের চওড়া রোদে এক অদ্ভুত রুক্ষতা। আমেরিকার চেনা খোলসটাও যেন নিমেষেই খসে পড়েছে। এখানকার হাওয়া, ধরনধারণ, কাউবয় টুপি আর সাজগোজে নিউ ইয়র্ক বা ফিলাডেলফিয়ার মার্কিন কাঠিন্য নেই, বরং পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এক নিখাদ মেক্সিকান আর স্প্যানিশ আমেজ। বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই কানে ভাসছে টুকরো টুকরো স্প্যানিশ শব্দ। আর সেই স্প্যানিশ পরিবেশেই আলাপ হল ছোট্ট লিয়ান্দ্রোর সঙ্গে। পরনে লাল-সবুজ পর্তুগাল জার্সি, পিঠে জ্বলজ্বল করছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নাম। কিন্তু মায়ের হাত ধরে সে চলেছে ডালাসের স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির খেলা দেখতে (Lionel Messi Birthday Particular)! কেন? এই অদ্ভুত প্রশ্নের কোনও উত্তর মা বা ছেলের কাছে নেই। গলায় ঝোলানো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটা দেখলেই স্থানীয়রা হাসিমুখে স্প্যানিশ টানে জিজ্ঞেস করছেন, ‘মেসি, উঁহু?’ হয়তো জাদুকরদের কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা দলের জার্সি হয় না, তাঁরা সব বিভাজনের ঊর্ধ্বে। এখানে যে বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছি, সেখানকার মালকিন রোসারিও যেমন ফ্যান পার্কে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার আগাম পরিকল্পনা করে আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘রাস্তায় কিন্তু অসম্ভব ভিড় হবে, সময় হাতে নিয়ে বেরোবেন।’
এই উন্মাদনার একটাই নাম- মেসি। কাতার বিশ্বকাপের পর এবার আমেরিকাতেও যে তিনি স্বপ্নের ফর্মে, তা আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে ৭৬ মিনিটে করা ওই অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিকই প্রমাণ করে দিয়েছে। একদিকে যখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী বাবা জর্জের শারীরিক অবস্থার চরম উদ্বেগ তাঁকে কুরে-কুরে খাচ্ছে, ঠিক তখনই মাঠে নেমে যন্ত্রণাকে সঙ্গী করেই তিনি হয়ে উঠছেন এক অমানবিক গোলমেশিন। তাঁর এই অতিমানবিক রূপ দেখে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি রোমারিও পর্যন্ত লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ‘ও গ্লোবো’ পত্রিকায় নিজের কলামে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘মেসিই এই বিশ্বকাপের সেরা তারকা। ও একটা দৈত্য!’ আগামী বুধবার ৩৯ বছরে পা দিতে চলেছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তার আগে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে এই ম্যাচটি জিতেই জাদুকরকে আগাম জন্মদিনের উপহার দিতে বদ্ধপরিকর তাঁর সতীর্থরা। আলজিরিয়া ম্যাচের পর আপ্লুত কোচ লিওনেল স্কালোনিও বলতে দ্বিধা করেননি, ‘শুধু তিন গোল করা নয়, গোটা দলটাকেই নিজের কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলেছে মেসি। যতদিন খেলবে, ও-ই সেরা। এই ৩৯ বছর বয়সে ওর এই পারফরমেন্সের কোনও ব্যাখ্যা হয় না।’
তবে আবেগ আর প্রশংসার স্রোতে গা না ভাসিয়ে স্কালোনি মগ্ন তাঁর রণকৌশল সাজাতে। আলজিরিয়া ফুটবল ফেডারেশন রেফারির বিরুদ্ধে ফিফায় যতই অভিযোগ জানাক না কেন, আর্জেন্টিনা শিবির সেসবে কান না দিয়ে কানসাস সিটির স্পোর্টিং কেসি ট্রেনিং সেন্টারে নিজেদের রুদ্ধদ্বার অনুশীলনে ঘাম ঝরিয়েছে। প্রথম ম্যাচে জর্ডনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আসা রালফ র্যাঙ্গনিকের অস্ট্রিয়া আলজিরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি গোছানো এবং শারীরিক দিক থেকে শক্তিশালী দল। অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক ডেভিড আলাবা মেসির হ্যাটট্রিককে ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়েও সতর্ক করেছেন, ‘আমরা জানি আর্জেন্টিনা দল হিসেবে কতটা ভয়ংকর। শুধু মেসি নয়, ওদের দলের বাকিরাও যে কোনও মুহূর্তে ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে।’ তাই প্রতিপক্ষের হাই প্রেসিং ফুটবলকে টেক্কা দিতে স্কালোনি দলে গতি বাড়াতে চাইছেন। স্ট্রাইকিং লাইনে লওটারো মার্টিনেজের বদলে শুরু থেকেই দেখা যেতে পারে গতিময় হুলিয়ান আলভারেজকে। থিয়াগো আলমাদার জায়গায় উইং দিয়ে জায়গা তৈরি করতে পারেন নিকোলাস গঞ্জালেস। চোট সারিয়ে ওঠা গঞ্জালেস মন্টিয়েল পুরো অনুশীলন করলেও ঝুঁকি না নিয়ে রাইট ব্যাকে নাহুয়েল মোলিনাকেই হয়তো প্রথম একাদশে রাখবেন কোচ। মাঝমাঠে রডরিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্ডেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সঙ্গে ডিফেন্সে থাকছেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজরা। সুযোগ পেলে নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো এবং লিয়ান্দ্রো পারেডেসও মাঠে নামতে পারেন।
সবমিলিয়ে কানসাসের বেস ক্যাম্পে এখন চূড়ান্ত ফুরফুরে মেজাজ। মহাতারকাকে যাতে কেউ বিরক্ত করতে না পারে, তার জন্য বেস ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রবেশও পুরোপুরি নিষেধ। তবে চাপমুক্ত থাকতে বেস ক্যাম্পে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার বিখ্যাত গায়ক কার্লোস ‘লা মোনা’ জিমেনেজ। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার উপস্থিতিতে সেই গানের আসর বেশ উপভোগ করেছেন মেসিরা। দলের সহকারী কোচ ও মেসির ছোটবেলার আইডল পাবলো আইমার ঠিকই বলেছেন, ‘টুর্নামেন্টের মাঝে দলের পরিবেশটা হালকা রাখা খুব জরুরি।’ সব ঠিক থাকলে ডালাসের এই টেক্সান রাতেই হয়তো মহাতারকার ৩৯তম জন্মদিনের আগাম উৎসবের বাঁশি বাজতে চলেছে।

