গেরুয়া পথ

শিক্ষা
Spread the love


যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্। সমগ্র বিশ্ব যেখানে একটি নীড়ে এসে মিলেছে। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত বিধুভূষণ শাস্ত্রীর পরামর্শে বিশ্বভারতীর সংকল্প-বাক্য হিসাবে এই বৈদিক মন্ত্রটি গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হবে বিদ্যার উৎপাদন, যেখানে বিদ্যা বিতরণ হবে গৌণ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যে কাজটি করে চলেছে দীর্ঘকাল ধরে।

বিদ্যার উৎপাদনে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির গৌরব রাজ্যকে মহিমান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ এবং সরকারি হস্তক্ষেপে এই কাজ ক্রমাগত ব্যাঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। গবেষণার যে পরিধি বিস্তারলাভ করেছিল, তা সংকুচিত হতে শুরু করে সরকারি অনুদানের অভাবে।

কেন্দ্র এবং রাজ্যে বর্তমানে একই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। অথচ মানোন্নয়নের পরিবর্তে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে শাসকদলের ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই। পূর্বতন সরকারও রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজ দলের কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালিয়েছিল। ফল মোটেও শুভ হয়নি। দুর্ভাগ্যের কথা, বর্তমান শাসকদল সেই একই কাজ আরও প্রবলভাবে করে চলেছে এবং স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সেকাজে উৎসাহ দিয়ে চলেছেন।

রাজ্যের বিজেপি সরকারের অভিযোগ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দেশবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যা নাকি বরদাস্ত করা চলবে না। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সমাবেশে দেশবিরোধী স্লোগান শোনা যাচ্ছে এবং দেওয়ালে সেইসব স্লোগান লেখা হচ্ছে। সরকারের এই দাবির প্রাথমিক কোনও যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, যে কোনও স্লোগানকে দেশবিরোধী দাগিয়ে দিলেই তা দেশবিরোধী হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।

গত কয়েক বছর ধরে দেখা গিয়েছে, বিজেপি সরকার বা দলীয় অনুগামীরা সারা দেশেই বিরোধী অভিমতকে দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে থাকে। এরাজ্যে সেই একই কুনাট্যের প্রদর্শন শুরু হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোহার ফটক টপকে সরকার অনুগামী ছাত্র সংগঠনের কিছু ছাত্র এবং বহিরাগত অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। ফলত সেখানে অনভিপ্রেত অশান্তির সৃষ্টি হয়।
এই অশান্তিতে অনুঘটকের কাজ করেন কসবা বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক। একজন নির্বাচিত রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে উত্তেজক স্লোগান দেওয়ার অব্যবহিত পর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শাসকদল এবং তার অনুগামীরা নিজেদের সনাতনী হিন্দু আখ্যায়িত করে থাকে বলে গৈরিক বর্ণের প্রতি তাদের তীব্র অনুরাগ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অশান্তির আগুন নির্বাপিত করার পরিবর্তে তাকে উসকে দিলে যে গৈরিক বর্ণকেই অপমান করা হয়, সেকথা বিস্মৃত হয়েছে শাসকদল এবং রাজ্য সরকার। রাজ্যের অভিভাবক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর উচিত ছিল, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গৌরবান্বিত ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস করা। তা না করে মুখ্যমন্ত্রী যদি গৈরিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে তা রাজ্যের শিক্ষার পরিবেশের পক্ষে মঙ্গলদায়ক হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়ে যাচ্ছে।

যখন রাজ্যের একপ্রান্তে এক চিলতে বাঁধের ওপর টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বন্যাবিধ্বস্ত নিরাশ্রয় মানুষের দল, তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে গৈরিকবর্ণে রঞ্জিত করার অভিপ্রায়ে সাধু-সন্ত সহ পথ পরিক্রমা করছেন। এই ছবি মোটেও রাজ্য সরকারের পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন নয়। উত্তরবঙ্গের যেসব এলাকা নদীভাঙনের কবলে পড়েছে, সেখানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের দায়িত্ব বন্যা রোধে একটি দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

অন্যদিকে, যাদবপুরের মতো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গতি রুদ্ধ করে সেখানে শাসকদলের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা কখনও সরকারের দায়িত্ব হতে পারে না। অথচ দুর্ভাগ্যের কথা, রাজ্য সরকার আপন দায়িত্ব বিস্মৃত হয়ে সেই কাজই করে চলেছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *