তিক্ততার পথে ঢাকা

তিক্ততার পথে ঢাকা

শিক্ষা
Spread the love


বহু দশকের চেনা প্রতিবেশী বাংলাদেশকে হঠাৎ বড় অচেনা মনে হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, ভারত বিরোধিতার সুর চড়া হচ্ছে বাংলাদেশের।‌ অথচ জন্মলগ্ন থেকে দেশটা ভারতের বন্ধু। বরং ১৯৪৭ থেকেই পাকিস্তান বরাবর ভারত-বিরোধী। দু’দেশের মধ্যে পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়েছে অনেকবার। অন্যদিকে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে ভারতের সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্কই ছিল।

২০২৪-এ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর মুহাম্মদ ইউনূসকে মাথায় রেখে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার সময় থেকে প্রথম এত চড়া সুরে ভারত বিরোধিতায় নেমেছে ঢাকা। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লির আশ্রয় দেওয়াকে অস্ত্র করে ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের ভারত বিরোধিতা আরও বেড়েছে।‌ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশ আগেও বার্তা পাঠিয়েছিল ভারতকে।‌ ভারত সরাসরি সেই বার্তার জবাব দেয়নি।

সম্প্রতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবিউনাল মানবতা-বিরোধী অপরাধের মামলায় হাসিনা এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। হাসিনার মতো আসাদুজ্জামানও ভারতে আশ্রিত এখন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী, গত ২১ নভেম্বর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফের চিঠি পাঠিয়েছে ভারতকে।‌

আপাতত মোদি সরকার ঢাকার চিঠি খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গিয়েছে যে, ভারত কি হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বাধ্য? কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, ভারত-বাংলাদেশের এই সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী কারোর প্রত্যর্পণ চাওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলে আশ্রয়দাতা দেশ তাঁকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়।‌ মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনে হাসিনা বলেছিলেন, এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাছাড়া অনির্বাচিত সরকারের রায়ের কোনও বৈধতাই নেই।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলও মনে করে, জনগণের ভোটে জিতে যারা ক্ষমতায় আসেনি, তাদের কিছু বলার অধিকার নেই।‌ সেই সরকার পরিচালিত, নিয়ন্ত্রিত আদালতের রায়েরও বৈধতা নেই। ফলে ঢাকার চাপের মুখে নয়াদিল্লি হাসিনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে তুলে দেবে কি না, সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন। ইতিমধ্যে আবার দিল্লিতে লালকেল্লার সামনে গাড়ি-বোমা বিস্ফোরণে তেরোজনের মৃত্যুর ঘটনাতেও বাংলাদেশকে সন্দেহের চোখে দেখছে ভারত।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আমন্ত্রণে দিল্লিতে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে এসে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান অবশ্য বলেছেন, বাংলাদেশ ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় ভারতের পাশে আছে।‌ ঢাকা সব সময়ই সন্ত্রাসের নিন্দা করে। খলিলুর ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শংকরকে তাঁর সুবিধামতো সময়ে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

তবে বাংলাদেশ যে আর আগের মতো ভারতবন্ধু প্রতিবেশী নয়, সেটা স্পষ্ট।‌ সাম্প্রতিক দুটি খবর নয়াদিল্লির পক্ষে যথেষ্ট উদ্বেগজনক।‌ প্রথমটি হল, নভেম্বর থেকে বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে ক্যারাটে এবং আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দেশের সাতটি জায়গায় এই প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বক্তব্য, এরা রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজনে দেশের সেনাবাহিনীকে সাহায্য করবে।

দ্বিতীয় খবরটি হল, পাক গুপ্তচর বাহিনী আইএসআই এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীরা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত ঢাকায় আসছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় অফিসারদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। বাংলাদেশের বাহিনীতে কোন কোন আধিকারিক বেশি ভারত-বিরোধী, তার খোঁজখবর করছেন। এত বছর প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারত যেভাবে দেখে এসেছে, ২০২৪-এর ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে আসার পর সেই অবস্থানে বিরাট পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে।

হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবিতে দিনকয়েক আগে ঢাকায় বিএনপি’র নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। তবে মোদি সরকার সহজে হাসিনাকে ঢাকার হাতে তুলে দেবে বলে মনে হয় না। ফলে যত দিন যাবে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে আরও খারাপের দিকে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *