Naxal | রাজনীতির ‘নকশাল’-এ পুরাণের ছায়া

শিক্ষা
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী : ‘নকশাল’, শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার একটি ছোট্ট জনপদ নকশালবাড়ির কথা। মনে পড়ে সত্তরের দশকের উত্তাল বাংলা, জমির লড়াই, কৃষকের মিছিল, পুলিশের গুলি, চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতালের নাম। ‘নকশাল’ শব্দটি যেন জন্ম থেকেই রাজনীতির। অথচ সেই শব্দের ভিতরেই নাকি লুকিয়ে আছে দেবাদিদেব মহাদেবের পুত্রের জন্মকথা! সম্প্রতি এমনই এক ব্যাখ্যায় তোলপাড় শুরু হয়েছে সমাজমাধ্যমে। ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন দেশের পরিচিত পুরাণচর্চাকারী দেবদত্ত পট্টনায়ক। পেশায় চিকিৎসক দেবদত্ত  দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কাজ করার পর পুরাণ ও সংস্কৃতির প্রতি নিজের আগ্রহকেই পেশা করেছেন। ইতিমধ্যেই পঞ্চাশের বেশি বইও লিখে ফেলেছেন। পুরাণকে আধুনিক জীবন, সমাজ, রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগি নকশাল’ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পট্টনায়কই তাঁর সমাজমাধ্যমের পোস্টে ‘দিমাগি নকশাল’ কথাটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।  তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘নকশাল’ হল উত্তরবঙ্গের নদীতীরবর্তী এলাকায় জন্মানো এক ধরনের নলজাতীয় ঘাস (কাশফুল)। যার ফুল রুপোলি আভাযুক্ত। আর ‘নকশালী’ হলেন সেই ঘাসের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিবপুত্র কার্তিকেয়। অর্থাৎ, রাজনীতির ‘নকশাল’-এর জন্মের অনেক আগেই প্রকৃতিতে ‘নকশাল’ ছিল। পট্টনায়ক বলছেন, দেবতারা শিবের কাছে তাঁর বীর্য চান। শিব তা শক্তির গর্ভে স্থাপন না করে, অগ্নির হাতে দেন। অগ্নি সেই তেজ ধারণ করতে না পেরে গঙ্গায় নিক্ষেপ করলে গঙ্গার জল ফুটতে শুরু করে। ফলে নকশাল ঘাসে আগুন ধরে যায়। সেই ছাইয়ের মধ্য থেকে জন্ম নেয় এক শিশু। পরে কৃত্তিকা নক্ষত্রমণ্ডল তাকে লালন করে। সেই শিশু কার্তিকেয়। দক্ষিণ ভারতের পরম্পরায় যার সঙ্গে ‘সরবণ’ বা জলাভূমির নলজাতীয় উদ্ভিদের যোগ পাওয়া যায়। পট্টনায়কের ব্যাখ্যায়, সেই ‘নকশাল’ থেকে যার জন্ম তিনিই ‘নকশালী’ বা শিবের পুত্র।

বিস্তারিত ব্যাখ্যায় পট্টনায়ক বলেছেন, নকশাল ঘাস জন্মানো নদীতীরে যে শিবের উপাসনা করা হয় তিনি ‘নকশালেশ্বর’ হিসাবেই পরিচিত। সেই অর্থে তিনি দিমাগি নকশালদের শিবভক্ত হিসাবেই বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, জন্মের পর কার্তিকেয় কাঁধে বাঁশের ঝোলানো দণ্ডে জলভরা পাত্র বহন করে কৈলাসে গিয়েছিলেন এবং পাত্রগুলি মাটিতে স্পর্শ হতে দেননি। সেটিই ছিল প্রথম কাঁওয়ার। নকশালীরা এখনও এই প্রথা মেনে চলেন। পট্টনায়কের এই ব্যাখ্যায় হইচই শুরু হয়েছে সর্বত্র। এককালের সশস্ত্র বিপ্লবের আঁতুড় কীভাবে দেব-দেবীর জন্মবৃত্তান্তের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, তার অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি বলেও মনে করছেন শিক্ষাবিদদের অনেকেই।

শিলিগুড়ির নকশালবাড়ি থেকে সোজা কৈলাস! রাজনীতির রুক্ষ জমিতে জন্মানো পৌরাণিক কাশফুল নিয়ে তাই কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে বেশ জোরকদমেই।

নকশালবাড়ির ‘নকশাল’ কি তবে শুধু রাজনৈতিক শব্দ নয়? শিক্ষাবিদ এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দিলীপ সরকারের কথা, ‘‘কোচবিহারের রাজাদের ভ্রমণ কাহিনী এবং ব্রিটিশ নথিতে ‘নাকসেরবাড়ি’ শব্দটি বারে বারে পাওয়া গিয়েছে। কোথাও নকশালবাড়ির উল্লেখ নেই। হতে পারে স্থানীয়দের উচ্চারণের পরিবর্তনে নাকসেরবাড়ি পরবর্তীতে নকশালবাড়ি হয়ে গিয়েছে। আর ব্রিটিশদের আগমনের আগে ওই এলাকা সেই অর্থে কোনও সভ্যতার অংশবিশেষ ছিল না। সেক্ষেত্রে নকশালবাড়িকে ঘিরে যে পৌরাণিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের জায়গা রয়েছে।’’ নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদারের ছেলে অভিজিৎ মজুমদার অবশ্য পট্টনায়কের ব্যাখ্যাকে একেবারেই অবজ্ঞা করতে রাজি নন। তাঁর বক্তব্য, ‘দেবদত্ত যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন আমি তা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলার পক্ষে নই। কোথাও বিষয়গুলির মধ্যে একটা সংযোগ থাকলেও থাকতে পারে। দিমাগি নকশাল কথাটির মধ্য দিয়ে মেধাবী মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে। দেবদত্ত তারই একটি মেধাবী ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।’

গবেষকদের অনেকেই বলেছেন, এই বিতর্কে ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণকে আলাদা করে দেখা জরুরি। নকশাল নামের উৎপত্তি যে নলখাগড়া জাতীয় ঘাস থেকেই- এমন প্রামাণ্য ভাষাতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। গবেষক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, ‘নকশালবাড়ি ১৯৬৭ সালে আন্দোলনের সময় তৈরি হয়নি। জায়গাটির নাম তার বহু আগের।’ ‘নকশাল’ শুনলে কেউ সশস্ত্র মাওবাদী বোঝেন, কেউ বিপ্লবী বামপন্থী, কেউ রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি, আবার কেউ শুধুই প্রতিবাদী মানুষকে কটাক্ষ করার রাজনৈতিক তকমা বোঝেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দটি উঠে আসার পর  সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ, পালটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা— এমনকি ‘দিমাগি নকশাল পার্টি’ নামেও সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনও ছড়িয়ে পড়েছে। তৈরি হচ্ছে গান, কার্টুন, নানা ধরনের মিম। উত্তরবঙ্গের মাটির সঙ্গে যুক্ত শব্দটিকে নিয়ে অযথাই কাটাছেঁড়া হচ্ছে বলে মনে করছেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং ভাষা গবেষক দীপককুমার রায়। তাঁর কথা, ‘নকশাল শব্দটি এসেছে নকশালবাড়ি থেকেই। এরসঙ্গে পুরাণের কোনও সম্পর্কই নেই। এমনকি বাংলা, রাজবংশী বা উত্তরের কোনও ভাষাতে বা শব্দভাণ্ডারে নকশাল শব্দটির আলাদা করে কোনও অর্থবহ ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় না। নকশালেশ্বর নামের কোনও দেবতার অস্তিত্বও উত্তরবাংলায় নেই। মনে হচ্ছে নতুন কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকেই নকশাল নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা সামনে আনা হচ্ছে।’

উত্তরবঙ্গের লোকভাষা বা লোকসাহিত্যের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেও দেবদত্তর পুরাণের ব্যাখ্যাটির গ্রহণযোগ্য কোনও সূত্র এখনও মেলেনি৷ গবেষকদের একাংশ অবশ্য বলছেন, বাংলার পাশাপাশি রাজবংশী-কামতাপুরি, অসমিয়া ও স্থানীয় উদ্ভিদ-লোকনামের অভিধান, পুরোনো ভূমি-নথি, মৌজা-নাম, লোকগান, ব্রতকথা, নদীসংলগ্ন উদ্ভিদের নাম, সবকিছু খুঁজে দেখা দরকার। তাঁদের যুক্তি, উত্তরবঙ্গে একটি উদ্ভিদের নাম এক গ্রামে যা, পাশের গ্রামে তা অন্য নাম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকতে পারে আসল গল্প।

হয়তো ‘নকশাল’ সত্যিই কোনও বিস্মৃত ঘাসের লোকনাম। হয়তো নয়। হয়তো নকশালবাড়ির নামের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কই নেই। আবার এমনও হতে পারে, কোনও প্রাচীন লোকনাম বহুদিনের ব্যবহারে বদলে গিয়ে আজকের উচ্চারণে পৌঁছেছে। প্রমাণ ছাড়া কোনওটিই বলা যাবে না।

কিন্তু একটা সত্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, উত্তরবঙ্গের মাটিতে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক শব্দ, ১৯৬৭ থেকে এখন পর্যন্ত কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত ক্ষমতাশালীদের ভয়ের অভিধানে পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছে। ‘নকশাল’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে যে মেধা-মন্থন শুরু হয়েছে, সেভাবেই যদি এই এলাকার উন্নয়ন নিয়ে চর্চা হত তাহলে ছবিটা হয়তো অন্যরকম হত।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *