সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: সময়ের স্রোতে বদলেছে অনেক কিছু। কিন্তু বদলায়নি আমিনপুর গ্রামের সাড়ে চারশো বছরের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ছবি। আজও এই গ্রামের জমিদার পরিবার তথা মাটিয়া কালীপুজোর (Kali Puja 2026) প্রতিমা তৈরির খড় আসে একটি মুসলিম পরিবারের ঘর থেকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতিতে ছেদ পড়েনি কখনও। জমিদার আমলের নানা প্রথা, লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে বুকে নিয়ে আজও পুজোয় মেতে ওঠেন আমিনপুর গ্রামের মানুষ।
গঙ্গারামপুর (Gangarampur) মহকুমার গঙ্গারামপুর, বংশীহারী, হরিরামপুর ও কুশমণ্ডি ব্লকের প্রাচীনতম কালীপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম কুশমণ্ড ব্লকের আমিনপুর গ্রামের মাটিয়া কালীপুজো। প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার হরিপুর বড় তরফ এস্টেটের জমিদার ভূপশ্রী গৌরীপ্রসাদ চৌধুরী এই পুজোর সূচনা করেন। গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে একটি পঞ্চবটী গাছের তলায় শুরু হয়েছিল পুজো। অনেকের মতে, এই গ্রামের পত্তনও করেছিল ওই জমিদার পরিবার। বর্তমানে পুজোর দেখভাল করেন জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি, দুই কন্যা সঞ্চয়িতা ও সুচিস্মিতা রায়চৌধুরী। পরিবারের জামাই সুদীপ রায়ও পুজোর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি বিশ্বনাথ সিংহ, কমলাপদ সিংহের মতো আমিনপুর গ্রামের বাসিন্দারাও পুজোর আয়োজনে যুক্ত হয়েছেন। কথিত আছে জমিদার মায়ের কাছে স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে, পুজোর আগে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মাটিতে বিছানা পেতে ঘুমোতে হবে। সেই থেকেই ওই রীতি আজও পালিত হয়। পুজোর কয়েকদিন আগে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। তখন বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা সেই রীতি পালন করেন।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরাও জুতো পরে মন্দিরের আশপাশে যাওয়ার সাহস পেতেন না। পুরোনো রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন প্রতিমা তৈরির খড় সংগ্রহ। যে মুসলিম পরিবারের থেকে প্রতিমা তৈরির খড় আনা হত, সেই পরিবারের বর্তমান সদস্য কাশেম আলির ঘর থেকে আজও খড় আসে।
পঞ্চবটী থেকে সামান্য দূরে জমিদার পরিবারই পঞ্চমুখী শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল। সারা বছর সেখানে ভক্তদের সমাগম হয়। মন্দিরের সামনে তৈরি মাটির ঘরে লোহার সিন্দুকে রাখা হত দেবীর গয়না ও পুজোর সামগ্রী। কয়েকশো বছরের পুরোনো সেই মাটির ভাণ্ডারঘর আজও রয়েছে। শোনা যায়, একবার গয়না চুরি করতে মন্দিরের তালা ভাঙলেও সিন্দুক ভেঙে গয়না নিয়ে যেতে পারেনি চোরেরা। সম্প্রতি জমিদার পরিবারের উত্তরসূরিরা ভারত সেবাশ্রম সংঘকে একশো শতক জমি দান করেছেন। এলাকার মানুষের কাছে মাটিয়া কালী অত্যন্ত জাগ্রত। সারারাত ধরে পুজোয় অংশ নেন বহু ভক্ত। পুজো উপলক্ষ্যে আগামী এক সপ্তাহ এলাকাজুড়ে নিরামিষ আহার পালন করা হবে। শেষে বিশাল শোভাযাত্রার মাধ্যমে দেবীর নিরঞ্জন হবে।

