বলো, কোথায় তোমার দেশ?

ব্লগ/BLOG
Spread the love


ডঃ বিকাশ দাস 

সাহিত্য ও গানের জগতে নদীকে ঘিরে রোমান্টিকতার শেষ নেই; বাঙালির জীবনেও নদী কখনও স্মৃতি, কখনও প্রেম, কখনও হারানোর গল্প। সাহিত্যপোকা আর পাঁচটা বাঙালি ছেলের মতো কৈশোরে নদীকে দেখে কাব্যি করলেও এখন নদীকে প্রেয়সীর থেকে রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে একা অভিমন্যু বলেই বেশি মনে হয়।

তাই আজও প্রশ্ন জাগে, বলো, কোথায় তোমার দেশ? একটি নদী যে দেশের ভূখণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়, তার জল, পলি, জীববৈচিত্র্য ও সম্পদের উপর অধিকার কিংবা তার প্রতি দায় কি শুধু সেই দেশের মানুষের ও শাসকের? নেপাল–তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিপর্যয় আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

হিমবাহের একটি অংশ ধসে বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত পাহাড়ি নদীপথে নেমে এসে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংস ডেকে এনেছে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। জল, পাথর আর পলির সেই স্রোত কোথায় গিয়ে থামবে, তার কোনও রাজনৈতিক মানচিত্র নেই। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ঘটনাপ্রবাহও সেই নির্মম সত্যকেই সামনে এনেছে। পাহাড়ের উঁচু অঞ্চলে শুরু হওয়া একটি বিপদ নদীপথ ধরে বহু দূরের জনপদ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু নেপালের একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নদীকে বুঝতে গেলে তার উৎস, গতিপথ, দুই তীরের মানুষ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পাহাড়, বন, কৃষিজমি ও জনপদকে একসঙ্গে দেখতে হয়। হিমালয়ের জলধারা নেপাল, ভুটান, চিন, ভারত এবং বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে একই জলভূগোলের মধ্যে যুক্ত করেছে।

তিব্বত থেকে ব্রহ্মপুত্র, নেপাল থেকে কোশী ও গন্ডক, আবার ভুটান ও সিকিমের পাহাড় থেকে তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকার মতো অসংখ্য নদী নেমে এসেছে সমতলের দিকে। এই জলধারাগুলিই মিলেমিশে গড়ে তুলেছে পূর্ব হিমালয় ও তার পাদদেশের বিস্তৃত পরিবেশগত ভূগোল।

একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, উত্তরবঙ্গের ভূগোল আসলে একটি বিশাল সংযোগের ভূগোল। উত্তরে হিমালয়, তার নীচে তরাই ও ডুয়ার্সের বন ও চা বাগান, নদীবিধৌত সমভূমি, আর তার পরে বাংলাদেশ। উত্তরবঙ্গের বন, কৃষি, চা বাগান, জনপদ, সংস্কৃতি ও জীবনের গড়ে ওঠা এবং টিকে থাকার পেছনেও এই নদী ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম।

এই সংযোগ শুধু নদী ও মানুষের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিস্তৃত জীববৈচিত্র্যের ভূগোলও। উত্তরবঙ্গের বনভূমি শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়। হাতি, গন্ডার, চিতাবাঘ সহ অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ এই নদী ও বনভূমির সঙ্গে যুক্ত; বহু বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথও নেপাল, ভুটান ও ভারতের বনভূমির সঙ্গে সংযুক্ত। কাজেই তিস্তা থেকে সংকোশ, কিংবা কালজানি থেকে মহানন্দা পর্যন্ত এই অঞ্চলকে শুধু জেলা, রাজ্য কিংবা দেশের প্রশাসনিক সীমানা দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।

অথচ আমাদের উন্নয়নের পরিকল্পনা এখনও অনেকাংশে প্রশাসনিক সীমানা ধরে তৈরি হয়। পাহাড়ে রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, পর্যটন বা নতুন নগরায়ণের পরিবেশগত প্রভাবকে অনেক সময় সেই নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। পাহাড়ে তৈরি একটি রাস্তা থেকে নেমে আসা মাটি নদীর গতিপথ বদলে দিতে পারে; তার অভিঘাত পৌঁছাতে পারে বহু দূরের কৃষিজমি, বনগ্রাম কিংবা চা বাগানের শ্রমিক লাইনে।

এখানে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তাদের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের একটি চা বাগানের শ্রমিক, নদীর চরের কৃষক কিংবা বনগ্রামের মানুষের জলবায়ু পরিবর্তনের দায় এক নয়। অথচ বন্যা, নদীভাঙন, ভূমিধস, অতিবৃষ্টির সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত অনেক সময় তাঁদেরই বহন করতে হয়। উন্নয়নের সুফল যদি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয় আর পরিবেশের ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্র, তবে সেই উন্নয়নকে কতটা ন্যায়সঙ্গত বলা যায়?

জলবায়ু পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। হিমালয়ের উষ্ণায়ন হিমবাহ, তুষার, বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন আনছে। নদীর পাড়ে হোটেল-রিসর্ট, বনভূমির কাছে নির্মাণ এবং পাহাড়ের ঢালে রাস্তা ও কংক্রিটের বিস্তার হিমালয়ের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। আমরা ভুলতে বসেছি যে হিমালয় একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বত, যার প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল।

হিমালয়ের পাদদেশে ভোগবাদী ও নব্য উদারনৈতিক উন্নয়নের এমন এক চক্রব্যূহ গড়ে তুলেছি, যেখানে অভিমন্যুর মতো প্রকৃতিই আজ পথ খুঁজে ফিরছে। ভূগোলের নির্মম শিক্ষা হল, প্রকৃতি মানুষের হিসাব মেনে চলে না। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে, নিজের ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়।

সাম্প্রতিক নেপাল–তিব্বত বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পাহাড়ে বিপদ সাধারণত একটি কারণেই আসে না। জলবায়ুগত পরিবর্তন, ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া একে অন্যের সঙ্গে মিলে ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের উন্নয়নের পরিকল্পনাও কি সেই অনুযায়ী বদলাবে না? হিমালয়কে কি আমরা শুধু পাহাড় হিসেবেই দেখব, তরাই ও ডুয়ার্সকে শুধু সমতল হিসেবে, আর নদীকে শুধু সেচ বা বন্যার সমস্যা হিসেবে? নাকি পাহাড়, নদী, বন, কৃষিজমি ও মানুষের বসতিকে একটি পরস্পরনির্ভর পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখব?

উত্তরবঙ্গের কাছে এই প্রশ্নটির একটি বাস্তব রাজনৈতিক অর্থও রয়েছে। তিস্তা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সিকিম থেকে নেমে উত্তরবঙ্গ পেরিয়ে বাংলাদেশে যাওয়া তিস্তা একদিকে জলবিদ্যুৎ ও সেচের, অন্যদিকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার জলবণ্টন নিয়ে স্থায়ী সমাধান হয়নি। তিস্তা একা নয়। উত্তরবঙ্গের বহু নদীই রাজ্য ও আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে প্রবাহিত হলেও তাদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে নদীর জল কখনও কূটনীতির বিষয়, কখনও রাজ্য ও কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ, আবার কখনও উন্নয়নের সম্পদ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, তথ্য ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ পাহাড়ে বিপদ তৈরি হওয়ার পর তথ্য পৌঁছালে তা আর আগাম সতর্কতা থাকে না। ভারত ও নেপালের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রমী নদীর বন্যা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা সংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে। ভারত ও চিনের মধ্যেও সীমান্ত অতিক্রমী নদীর জলসংক্রান্ত তথ্য ও বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু জলস্তরের তথ্য যথেষ্ট হবে না।

হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদের পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালের অস্থিরতা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং নদীর পলিপ্রবাহ সম্পর্কিত তথ্যও দ্রুত ভাগ করে নেওয়া জরুরি। কারণ একটি দেশের পাহাড়ে শুরু হওয়া বিপদের অভিঘাত অন্য দেশের নদী ও জনপদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের হিমালয় নীতিতে আমাদের ভাবনার ধরনই বদলাতে হবে। ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যে নদী, পরিবেশ এবং দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন। সময় এসেছে হিমালয়কে আর শুধু একটি পর্বতমালা হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত, পরস্পরনির্ভর পরিবেশগত অঞ্চল হিসেবে ভাবার।

একই সঙ্গে দেশের সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির মধ্যে নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাঁধ, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ বা পর্যটনের মতো বড় প্রকল্পের আগে তার প্রভাব শুধু প্রকল্পস্থলে নয়, পুরো নদী অববাহিকা ও বনভূমির উপর বিবেচনা করা জরুরি। স্থানীয় মানুষ, বনবাসী, কৃষক, চা শ্রমিক ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকেও সেই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

কারণ নদী আমাদের সবচেয়ে সহজ ভূগোলের পাঠটি বারবার শেখায়, এক জায়গার সিদ্ধান্ত কখনও শুধু এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ভবিষ্যতের উন্নয়ন যদি সত্যিই টেকসই করতে হয়, তবে আমাদের নীতির কেন্দ্রেও নদীর মতোই এই আন্তঃসংযোগকে জায়গা দিতে হবে। মানচিত্রে সীমান্ত থাকতে পারে, রাষ্ট্রের সীমারেখাও থাকবে। কিন্তু নদীকে, তার বিপদকে এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের ভবিষ্যৎকে সেই সীমারেখার মধ্যে আটকে রাখা অসম্ভব।

(লেখক কাশ্মীর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। ফালাকাটার বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *