উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সাধারণত আমাদের বদ্ধমূল ধারণা হল, কোলেস্টেরল মানেই তা বয়স্ক, স্থূল বা ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের সমস্যা। কিন্তু বাইরে থেকে সম্পূর্ণ ফিট দেখতে মানুষটিও যে কোলেস্টেরলের শিকার হতে পারেন, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর একটি দেশব্যাপী সমীক্ষায় সেই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে (ICMR Research)। আইসিএমআর-ইন্ডিয়াব (ICMR-INDIAB)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৮৭.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তেই ফ্যাটের ভারসাম্যহীনতা বা ডিসলিপিডেমিয়া রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি দশজনের মধ্যে নয়জন ভারতীয়র রক্তেই কোলেস্টেরলের মাত্রা অস্বাভাবিক, যা আজ নীরব মহামারির আকার নিয়েছে।
দেশের প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে মোট ২৩,৬৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের রক্তের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করে রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। সমীক্ষা বলছে, দেশে প্রায় ৩৫.৫ কোটি মানুষ রয়েছেন, যাঁদের রক্তচাপ স্বাভাবিক, সুগার নেই, এমনকি ওজনও ঠিকঠাক, অথচ তাঁদের রক্তেও লুকিয়ে রয়েছে মারণ কোলেস্টেরল। জ্বর বা ব্যথার মতো ডিসলিপিডেমিয়ার কোনও পূর্ব লক্ষণ থাকে না। বছরের পর বছর ধমনীতে অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট জমে তা সরু হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে আচমকা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই শুধুমাত্র অসুস্থ বা স্থূল মানুষদেরই কোলেস্টেরল পরীক্ষা করাতে হবে, এই পুরোনো ধ্যানধারণা বদলানোর সময় এসেছে।
চেন্নাইয়ের ডাঃ মোহনস ডায়াবিটিস স্পেশালিটি সেন্টারের চেয়ারম্যান এবং এই সমীক্ষার অন্যতম গবেষক ডাঃ ভি মোহন জানিয়েছেন, হৃদযন্ত্রের সুস্থতা শুধু জিনগত কারণের ওপর নির্ভর করে না, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার ওপরও নির্ভরশীল। রক্তে ‘গুড কোলেস্টেরল’ বা হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এইচডিএল)-এর মাত্রা কমে যাওয়াই এই সমস্যার প্রধান কারণ। প্রতি তিনজনে দুজনের রক্তেই এইচডিএল উদ্বেগজনকভাবে কম। আমাদের খাবারে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়িয়ে গুড কোলেস্টেরল কমিয়ে দিচ্ছে, যা ৯০ শতাংশ ভারতীয়ের ডিসলিপিডেমিয়ায় ভোগার মূল কারণ। সুস্থ থাকতে ডাঃ মোহন প্লেট-কনসেপ্ট বা ‘খাবারের থালা’-র নিয়ম মানার পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে এক-চতুর্থাংশ কার্বোহাইড্রেট, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন এবং বাকি অর্ধেক শাকসবজি ও ফলমূলের ফাইবার থাকবে।
ভারতীয়দের বিপাকীয় ধরন বা মেটাবলিক প্রোফাইল এমনিতেই কিছুটা আলাদা। ওজন স্বাভাবিক থাকলেও ভারতীয়দের শরীরে দ্রুত গুড কোলেস্টেরল কমে যায় এবং এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যায়। এর সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যা অকাল হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক, ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যেই ডিসলিপিডেমিয়ার হার সবচেয়ে বেশি। এছাড়া পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এই অস্বাভাবিকতা বেশি। কায়িক শ্রম কমে যাওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রাম ভারতও আজ আর সুরক্ষিত নয়।
যাদের বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই বেশি এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করে, তাঁদের রক্তে ফ্যাটের অস্বাভাবিকতা সবচেয়ে বেশি। সারাদিন বসে কাজ করা বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এই বিপদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবিটিস বা প্রেশার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে অল্প বয়স থেকেই নিয়মিত লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো জরুরি। রোজ শরীরচর্চা, আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার ও ট্রান্স ফ্যাট বর্জন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এই সাইলেন্ট কিলারকে হারানো সম্ভব।

