শুভদীপ ব্যানার্জি, নয়াদিল্লি: শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে কি নতুন নীতি আনতে চলেছে মোদি সরকার? নয়াদিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলনে ১১ জন রাষ্ট্রপ্রধান স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্রে সেই সম্ভাবনা নাকচ করতে পারছেন না প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। এই সম্মেলনের বড় সাফল্য হল চিন ও ভারতের মুখোমুখি ফলপ্রসূ আলোচনা। যেখানে কোনও দ্বিপাক্ষিক সমস্যাকেই আর সামরিক সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে না বলে ঠিক হয়েছে। কথা বলে সমাধানের রাস্তা খুঁজতে সম্মত হয়েছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও।
এতে নয়াদিল্লির সঙ্গে বেজিংয়ের সম্পর্কে উষ্ণতা ফিরতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সামরিক রণকুশলীদের মতে, সেক্ষেত্রে দাবার ছকে চাল বদলালেও চিকেনস নেক (Hen’s Neck) নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে ভারতকে। চুম্বি উপত্যকায় বেজিংয়ের বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতি চিন্তায় রেখেছে ভারতের নিরাপত্তাকে। তাই উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে কোনও আপসে রাজি নয় নয়াদিল্লি। ফলে চিকেনস নেক করিডরের নিরাপত্তার গুরুত্ব লঘু থাকছে না।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চ থেকে ঘোষণায় একটু হলেও জিনপিং ও তাঁর সফরসঙ্গী চিনা প্রশাসনিক কর্তাদের নরম অবস্থান অত্যন্ত ইতিবাচক দিক নির্দেশ করছে। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রকের এক আধিকারিক রবিবার বলেন, অন্য একটি দিক ভাবনাচিন্তা করছে সরকার। শিলিগুড়ি করিডর লাগোয়া বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম এবং যুদ্ধাস্ত্র সংক্রান্ত চুক্তি করতে চলেছে চিন।
তুরস্ক-সৌদি আরব-পাকিস্তানের মক্কা চুক্তিতে নাম লেখাতে আগ্রহী তারেক রহমানের সরকার। ফলে চিন নরম মনোভাব দেখালেও আদতে চিকেনস নেকের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বেজিংয়ের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। ইঙ্গিতপূর্ণভাবে এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের আমন্ত্রণ এড়িয়ে গিয়েছেন রহমান।
সম্প্রতি অরুণাচল নিয়ে ভারত-চিনের মধ্যে কিছু মনকষাকষি হওয়ায় নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে জিনপিংয়ের আসা না আসা নিয়ে দোলাচল ছিল। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর থেকে অরুণাচলপ্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বত বলে দাবি করে এসেছে চিন। অরুণাচলের একাধিক এলাকার চিনা নাম দিয়ে সেই দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখার নীতি ছিল সেদেশের সরকারের। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং ভারতের পালটা পদক্ষেপে দু’দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল।
কিন্তু শেষপর্যন্ত জিনপিং নয়াদিল্লিতে এসে আগ্রাসনের বদলে সহনশীলতার বার্তা দিয়ে গেলেন ভারত মণ্ডপমে। সাত বছর পরে ভারতে এসেছিলেন চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং। তাঁর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (PM Narendra Modi) মুখোমুখি আলোচনা যথেষ্ট ফলপ্রসূ। অথচ গঙ্গা জলচুক্তি সহ একাধিক বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে নিমরাজি ঢাকা। এই অবস্থায় চিকেনস নেক নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং উপমহাদেশের লাগোয়া দেশগুলির ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখছে দিল্লি।
গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকবার শিলিগুড়ি গিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা। বিএসএফের ক্ষমতা বাড়ানো, শিলিগুড়ি করিডর লাগোয়া বিহারের কিশনগঞ্জ, অসমের ধুবড়ি এবং চোপড়ায় তিনটি সেনা গ্যারিসন তৈরি ছাড়াও একগুচ্ছ পদক্ষেপ করা হবে বলে কেন্দ্রের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনমাইল হাট থেকে রাঙ্গাপানি পর্যন্ত মাটির নীচ দিয়ে রেলপথ তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়েছে।
ন্যাটোর মতো ব্রিকস কোনও সামরিক জোট নয় ঠিকই, তবুও ৪৫ পাতার বিবৃতিতে সামগ্রিকভাবে একে অন্যের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রশ্নে ব্রিকস গোষ্ঠীর দেশগুলি একমত হয়েছে। তাতে সম্মিলিত নিরাপত্তাকে জোরদার ও পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি চিকেনস নেকের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গালওয়ান সংঘর্ষ তো বটেই, অপারেশন সিঁদুরের সময় বেজিংয়ের ভূমিকা নিয়ে ভারতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিকসে চিনের অবস্থান ভারতের জন্য সন্তোষজনক।
ব্রিকস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন রবিবার একে ছুটির দিন থাকলেও রণকৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বসেছিলেন হিসেবের খাতা নিয়ে। একমঞ্চে ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিংকে পেয়ে আখেরে কতটা লাভ হল, খতিয়ে দেখে এখন পদক্ষেপ করার ভাবনা ভারতের।

