উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: যাঁদের ডায়াবিটিস (Diabetes) রয়েছে, তাঁদের সাধারণ প্রশ্ন, ‘আমি কি ফল খেতে পারব, নাকি ফল একেবারেই বন্ধ?’ অনেকেই ভয়ে ফল খাওয়া ছেড়ে দেন, কেউ বা অতিরিক্ত পরিমাণে ফল খেয়ে রক্তে শর্করা বাড়িয়ে ফেলেন। আসলে এই দুই ধারণাই সঠিক নয়। ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য ফল নিষিদ্ধ নয়, বরং সঠিক ফল, সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে খাওয়াই হল প্রধান বিষয়। লিখেছেন জেনারেল ফিজিশিয়ান ডাঃ এসএ মল্লিক।
ফল আমাদের শরীরের জন্য ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খাদ্য আঁশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে গরমকালে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। ফলে জলশূন্যতা, ক্লান্তি এবং মিনারেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই সময় কিছু ফল শরীরকে যেমন সতেজ রাখে, তেমনি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াতে সাহায্য করে। তাই ফলকে শত্রু না ভেবে, বুদ্ধিমানের মতো খাদ্যতালিকায় জায়গা দেওয়াই উচিত।
ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য অন্যতম উপকারী ফল হল জাম (কালোজাম)। বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ফলটি শুধু সুস্বাদুই নয়, এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবার। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জামের কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে এটিকে ওষুধের বিকল্প মনে করা যাবে না। প্রতিদিন একমুঠো পরিমাণ পাকা জাম খাওয়া যেতে পারে।
পেয়ারা ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য আরেকটি অত্যন্ত ভালো ফল। এতে চিনি তুলনামূলক কম এবং ফাইবার অনেক বেশি। ফলে রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ে না। পাশাপাশি এতে প্রচুর ভিটামিন-সি থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। খোসা সহ পেয়ারা খেলে আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়।
আপেল সারাবছর পাওয়া যায় এবং এটি ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ ফলগুলোর একটি। এতে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার (পেকটিন) রক্তে শর্করার ওঠানামা কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একটি মাঝারি আকারের আপেল খাওয়া যেতে পারে। আপেলের রসের পরিবর্তে সম্পূর্ণ আপেল খাওয়াই অনেক বেশি উপকারী।
মাল্টা বা মুসম্বি গরমের দিনে শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। এতে প্রচুর ভিটামিন-সি এবং জল থাকে। তবে ফলের রস না খেয়ে গোটা ফল খাওয়াই উচিত, কারণ রস তৈরি করলে ফাইবার নষ্ট হয়ে যায় এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
পেঁপে ডায়াবিটিকদের জন্য নিরাপদ ও উপকারী ফল। এতে ক্যালোরি কম, ফাইবার বেশি এবং হজমেও সাহায্য করে। যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য পাকা পেঁপে বিশেষ উপকারী হতে পারে।
তরমুজ নিয়ে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন ডায়াবিটিস থাকলে তরমুজ একেবারেই খাওয়া যাবে না। তরমুজে জলের পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ। এতে প্রাকৃতিক চিনিও থাকে। তাই একসঙ্গে বেশি না খেয়ে এক কাপ বা
প্রায় ১৫০ গ্রাম পরিমাণ তরমুজ খাওয়া যেতে পারে। পরিমাণ নিয়ন্ত্রণই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি উপকারী ফল হল খরমুজ। এতে জল, পটাশিয়াম ও ভিটামিন-এ প্রচুর পরিমাণে থাকে। তবে এটিও সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। একবারে বেশি খেলে রক্তে শর্করা বাড়তে পারে।
অনেকেই ভাবেন, ডায়াবিটিস থাকলে আম সারাজীবনের জন্য বিদায়। বাস্তবে আমে প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকলেও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। একটি ছোট আকারের আমের অর্ধেক বা কয়েক টুকরো, সপ্তাহে এক-দু’দিন, খাবারের অংশ হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। তবে আমের রস, ম্যাঙ্গো শেক বা অতিরিক্ত পাকা বড় আম একসঙ্গে খাওয়া উচিত নয়।
লিচু অত্যন্ত সুস্বাদু হলেও এতে প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকে। তাই ডায়াবিটিস রোগীদের লিচু খাওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা দরকার। একবারে চার থেকে ছয়টি লিচুর বেশি না খাওয়াই ভালো এবং খালি পেটে কখনও লিচু খাওয়া উচিত নয়।
ফল কখন খাবেন
ফল কখনও বড় খাবারের পর মিষ্টির মতো খাওয়া উচিত নয়। বরং সকালের জলখাবার ও দুপুরের খাবারের মাঝামাঝি অথবা বিকেলের হালকা টিফিনের সময় ফল খাওয়া বেশি উপকারী। এতে রক্তে শর্করার ওঠানামা তুলনামূলক কম হয়।
গোটা ফল উপকারী
ফলের রসের পরিবর্তে সবসময় গোটা ফল খান। এক গ্লাস ফলের রস তৈরি করতে কয়েকটি ফল লাগে। এতে প্রচুর প্রাকৃতিক চিনি শরীরে একসঙ্গে প্রবেশ করে। অথচ গোটা ফল খেলে ফাইবারের কারণে চিনি ধীরে ধীরে শোষিত হয়। তাই জুস, প্যাকেটজাত ফলের রস বা চিনি মেশানো ফলের পানীয় যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
সক্রিয় জীবনযাপনও জরুরি
ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ফল নয়, পুরো জীবনযাপনই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো ওষুধ খাওয়া এবং নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা- এসব একসঙ্গে মেনে চললে ফলও নিশ্চিন্তে খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। প্রত্যেক মানুষের শারীরিক অবস্থা আলাদা। তাই কারও কিডনির সমস্যা, স্থূলতা বা অন্য কোনও অসুখ থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ফলের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
ডায়াবিটিস মানেই জীবনের সব আনন্দ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সচেতনতা, পরিমিতিবোধ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসই শর্করা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। গরমকালের রঙিন ফলগুলোকে ভয় না পেয়ে, জ্ঞান ও সংযমের সঙ্গে বেছে নিন। মনে রাখবেন, ফলের শত্রু ডায়াবিটিস নয়, বরং অতিরিক্ত পরিমাণে, ভুল সময়ে খাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসই আসল সমস্যা। সুস্থ থাকুন, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং পরিমিতভাবে মরশুমি ফলের স্বাদ উপভোগ করুন।

