তন্দ্রা চক্রবর্তী, কোচবিহার : নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের ময়না কাঠ না পেলে তৈরি করা যায় না বড়োদেবীর মূর্তি। এমনই একাধিক অভিনব নিয়ম রয়েছে কোচবিহারের(Cooch Behar) শতাব্দীপ্রাচীন এই শক্তি আরাধনার। দেবীপক্ষে গোটা রাজ্য যখন মেতে উঠছে দুর্গাপুজোর আনন্দে, তখন কোচবিহারের এই উৎসবও ধারে-ভারে এবং আচারের অনন্যতায় এগিয়ে থাকছে কয়েক যোজন।
শ্রাবণ মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে ময়না গাছের ডাল অর্থাৎ ‘যূপচ্ছেদন’ দিয়ে শুরু হয় রাজপরিবারের(Royal Puja) আরাধ্য বড়োদেবীর পুজোর(Borodebi Pujo) প্রস্তুতি। ডাঙ্গরআই মন্দিরে দেবীর মুখাবয়ব বসিয়ে সেখানে পুজোর পর ওই কাঠ নিয়ে আসা হয় মদনমোহনবাড়িতে। এক মাস ধরে হয় তার ‘ধর্ম পাঠপুজো’। এরপর বাজনা বাজিয়ে সেই কাঠ নিয়ে যাওয়া হয় বড়োদেবীর মন্দিরে। সেখানে দুধ, দই, ঘি, মধু, অগুরু, চন্দন দিয়ে স্নান এবং পুজোর পর তাকে স্থাপন করা হয়। তিনদিন চলে ‘হাওয়া খাওয়া’ পর্ব। রীতি অনুযায়ী তুফানগঞ্জ মহকুমার চামটা গ্রামের দেবোত্তরের মাটি দিয়ে বড়োদেবীর মুখে ও গায়ে প্রলেপ দেওয়ার পর শুরু হয় মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ার কাজ। মহালয়ায় আঁকা হয় দেবীর চোখ।
প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত তন্ত্রমতে পুজো চলে, প্রাচীন তালপাতার পুঁথিতে লেখা মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে। দ্বিতীয়ায় হয় ‘দেও দেখা’। প্রায় ৩ ফুট লম্বা জলভর্তি কোষাতে দর্শন করা হয় দেবীর। ষষ্ঠীতে বাণেশ্বর থেকে ২ জোড়া বেল মদনমোহনবাড়িতে নিয়ে আসেন দুয়ার বক্সী। ‘বিল্ববরণের’ পর এক জোড়া বেল যায় দেবীবাড়িতে। তাই দিয়ে তৈরি হয় নবপত্রিকা।
এখানে রক্তবর্ণ দেবীমূর্তির সঙ্গে দেখা যায় না লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশকে। থাকেন জয়া-বিজয়া। দু’দিকে থাকে বাঘ-সিংহ। মূর্তির মতোই পুজোর নিয়মও অনেকটা আলাদা। অষ্টমীর রাতে মন্দিরের পূর্ব দিকের ছোট ঘরে হয় ‘নিশিপুজো’ বা ‘গুপ্তপুজো’-র আয়োজন। নররক্ত ছাড়া এই পুজো সম্পন্ন হয় না। কথিত আছে, একসময় এই পুজোয় হত নরবলি। বর্তমানে চালের পিটুলি দিয়ে মানুষের একটি ছোট মূর্তি তৈরি করে সেখানে বংশপরম্পরায় আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে আসছে শৈলেন রায়ের পরিবার। এরপর সেই মূর্তি বলি দেওয়া হয়। একই সময় পেছনের ঘরে চলে ‘চালিয়াবাড়িয়া’ পুজো। এক সাহায্যকারীকে নিয়ে বংশপরম্পরায় বিমল দাস সেই পুজো করেন। পুজো শেষে মন্দিরের পেছনে হয় শূকর বলি। এই শূকর বলি অন্য কোনও দুর্গাপুজোয় দেখা যায় না।
কোচবিহারের বিভিন্ন মন্দিরে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই বলি প্রথা। তন্ত্রমতে পুজো হওয়ায় বলি এখানে অপরিহার্য। দেবীবাড়িতে অষ্টমীর দিন মোষবলি হলেও অন্যান্য দিন পাঁঠা, পায়রা, চালকুমড়ো বলি হয়। দশমীর বিসর্জনও এখানে অন্যরকম।
সাধারণত প্রতিমা ঘাটে নিয়ে গিয়ে সাতপাক ঘুরিয়ে জলে ভাসান দেওয়া হয়। কিন্তু বড়োদেবীর যমুনাদিঘিতে ভাসানের আগে হয় আরেক প্রস্থ পুজো। আবার শূকর বলি দেওয়া হয় সেখানে। এরপর দেবীমূর্তি খণ্ড করে বিসর্জন হয়। দশমীর সকালেই বড়োদেবীর মূল ঘট চলে যায় মদনমোহনবাড়ির কাঠামিয়া মন্দিরে। এখানে কাঠামিয়া মন্দিরের দুর্গার ঘট, বড়োদেবীর ঘট এবং ভবানী মন্দিরের ঘট নিয়ে হয় অপরাজিতা পুজো, শান্তিস্বস্ত্যয়ন। দুর্গাপুজোর এক মাস পরে জগদ্ধাত্রীপুজোর অষ্টমীতে বড়োদেবীর মন্দিরে হয় বামাপুজো। আর এভাবেই শেষ হয় বড়োদেবীর পুজোর আচার।
