শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার : নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন রায়ের কুমন্তব্যের পরেও বিজেপি কার্যত নীরব। পদ্ম শিবির এখন পর্যন্ত নগেনের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপই করেনি। নগেন বারবার বেলাগাম মন্তব্য করলেও এবার তিনি সব সীমা অতিক্রম করে স্বয়ং দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিশানা করেছেন। নেতাজিকে নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক কুমন্তব্য ও কটাক্ষের জেরে গোটা রাজ্যের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁর অবদান অবিস্মরণীয়, তাঁকে নিয়ে শাসকদলের একজন সাংসদের এমন অবমাননাকর মন্তব্য আপামর বাঙালির আবেগে চরম আঘাত হেনেছে।
বিভিন্ন মহল থেকে তাঁর শাস্তির দাবি উঠলেও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজেপি দায় এড়াতেই ব্যস্ত। বিজেপির রাজ্য সহ সভাপতি তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক বলেছেন, ‘এটি ওঁর নিজস্ব বক্তব্য। দল ওই বক্তব্যকে কোনওভাবেই সমর্থন করে না।’ দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামীর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘উচ্চ নেতৃত্ব বিষয়টি দেখছে।’
নগেন অবশ্য এবারই প্রথম নয়, এর আগেও নানা সময়ে একের পর এক বিতর্কিত এবং প্ররোচনামূলক মন্তব্য করে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলেছেন। কখনও তিনি প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে পৃথক কোচবিহার রাজ্যের জোরালো দাবি তুলে বাংলাভাগের উসকানি দিয়েছেন, কখনও আবার নিজেকে ভগবান, মহারাজা বলে ঘোষণা করেছেন। ইতিহাস বিকৃত করে চরম বিতর্ক বাধিয়েছেন বরাবরই। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও কাঠামো নিয়ে অবমাননাকর কথা বলেছেন। উত্তরবঙ্গের মানুষের একাংশকে উসকে দিয়ে তিনি বারবার রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন বলে অভিযোগ। আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁর এই ধারাবাহিক অবমাননাকর, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও প্ররোচনামূলক মন্তব্যের পরেও ভোট রাজনীতির অঙ্ক কষে গেরুয়া শিবির আজ পর্যন্ত নগেনের বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করেনি। ক্ষোভ উগরে ফরওয়ার্ড ব্লকের জেলা সভাপতি দীপক সরকার বললেন, ‘বিজেপির সাংসদ কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন। তাই বিজেপিকে এই দায় নিতে হবে। তারা কেন এখন পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল না? নগেন রায় ইতিহাসই জানেন না। পড়াশোনা না করেই নেতাজিকে নিয়ে এসব মন্তব্য করেছেন। যাঁরা নেতাজিকে নিয়ে কুমন্তব্য করেন তাঁদের ঘৃণা করা উচিত।’
রাজবংশী সম্প্রদায়ের একটি নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে গ্রেটার নেতা নগেনের বেশ কিছু অন্ধ অনুগামী রয়েছেন। নগেন উত্তরবঙ্গের একটি বড় ভোটব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখেন বলেই বিজেপি নেতৃত্ব বারবার তাঁর এই সমস্ত অন্যায় ও ঔদ্ধত্যকে প্রকাশ্যেই তোল্লা দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। নগেনের কিছু অনুগামী এতটাই ‘অন্ধভক্ত’ যে নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের পরেও তাঁরা নগেনের সমর্থনে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হচ্ছেন। নগেন যা মন্তব্য করেছেন তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মন্তব্য, তাঁর বক্তব্যকে দল সমর্থন করে না বলে বিজেপি নেতারা এখন সাফাই দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা নগেনের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপও করেননি। কী কারণে এই দ্বিচারিতা, তা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়েছে। কোচবিহার কলেজের অধ্যাপক ডঃ সুকান্ত ঘোষের দাবি, ‘এই মন্তব্যের পর বিজেপির উচিত ছিল নগেন রায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। কারণ উনি যেভাবে নেতাজির মতো দেশপ্রেমিককে অপমান করেছেন তাতে শুধু ভারতই নয় গোটা বিশ্বের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছোচ্ছে।’ সন্তানদলের উত্তরবঙ্গের আহ্বায়ক সঞ্জিত দাস বললেন, ‘নগেন রায়ের কুমন্তব্য আমার মতো কোটি কোটি নেতাজিপ্রেমীর মনে আঘাত করেছে। ওঁর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা মাঝেমধ্যেই নগেনের কোচবিহারের রাজপ্রাসাদসম বাড়িতে ছুটে যান। তাঁর সঙ্গে রীতিমতো রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এই মাত্রাতিরিক্ত রাজনৈতিক আনুকূল্য এবং ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পেয়েই নগেন নিজেকে রীতিমতো সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করেছেন। তবে নগেনের এই লাগামছাড়া আস্ফালন ও ঔদ্ধত্যের জন্য যে শুধু বর্তমান শাসকদল বিজেপি দায়ী, তা কিন্তু একেবারেই নয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসও তাঁকে ঠিক একই কায়দায় তোল্লা দিয়েছে। তাঁকে নিজেদের দিকে টেনে রাজবংশী ভোট বাড়াতে তৃণমূলের রাজ্য সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ দিয়েছিল।
আজ যখন তিনি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামীর অবদানকে প্রকাশ্যে কালিমালিপ্ত করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন, তখন রাজনৈতিক দলগুলো কেবল নিজেদের পিঠ বাঁচাতে দায় এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু দিনের শেষে এই দুই সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলই নগেনের এই ঔদ্ধত্যের বীজ সযত্নে বপন করেছে। ভোটের সংকীর্ণ স্বার্থে একজন বিতর্কিত ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা’কে মাথায় তোলার চরম মাশুল গোটা রাজ্যবাসীকে চোকাতে হচ্ছে। এই ঔদ্ধত্যের লাগাম টানতে নানা মহল থেকে অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।

