কোচবিহার: ২০২৬-এর আগে ঐক্যবদ্ধ তৃণমূল গড়ার ডাক কয়েকদিন আগে দিয়েছিল তৃণমূলের কোচবিহার জেলা নেতৃত্ব। এদিন বিজয়া সম্মিলনি থেকে তা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু দলের জেলা স্তরের সেই বিজয়া সম্মিলনি মঞ্চেই অনুপস্থিত থাকলেন দলের নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ সহ তাঁর গোষ্ঠীর লোকজন। আর অনুপস্থিত থাকা নেতাদের কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহর। তাঁর টার্গেট যে মূলত দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি তা কারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি। উদয়নের সাফ কথা, ‘কাকে নেতা বলা হবে, আর কাকে নেতা বলা হবে না তা এখন চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে।’ রবি ঘোষকে ইঙ্গিত করে উদয়ন বলেন, ‘কয়েকটি পুরসভার চেয়ারম্যানের উপর দলের জেলা নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নেই। এঁদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বন্যায় বর্তমান সংকট পরিস্থিতি, বিজেপির সঙ্গে লড়াই ইত্যাদি নিয়ে যখন দল ব্যস্ত, তখন কেউ কেউ বাজিমেলার উদ্বোধন ও মূর্তির রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। এসব বন্ধ না করলে দলের ভালো হবে না।’
সাংসদ জগদীশ বর্মা বসুনিয়া বলেন, ‘বিজেপিকে জেলায় কোনও জনসংযোগ করতে দেওয়া যাবে না। কোচবিহারে জেলায় তাদের সমস্ত কর্মসূচি ভন্ডুল করতে হবে। তারা যাতে কোচবিহার জেলায় কোনওরকম রাজনৈতিক কর্মসূচি, পরিকল্পনা করতে না পারে সেটা আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।’ পাশাপাশি পঞ্চায়েত সদস্যদের কাজকর্ম অঞ্চল সভাপতি ও ব্লক সভাপতিদের নজর রাখার নির্দেশ দেন। বিজেপির জেলা সভাপতি অভিজিৎ বর্মন বলেন, ‘আমরা বিজেপি, জেলায় আমাদের কর্মসূচি করে যাব। তৃণমূলের যদি ক্ষমতা থাকে ওরা আটকে দেখাক।’
শুক্রবার দুপুরে কোচবিহারের রবীন্দ্র ভবনে তৃণমূলের জেলা স্তরের বিজয়া সম্মিলনি ও বর্ধিত সভা হয়। সেই সভায় মন্ত্রী, সাংসদ জগদীশ বর্মা বসুনিয়া, জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক (হিপ্পি) ছাড়াও দলের জেলা চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন, বিধায়ক পরেশ অধিকারী, তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের জেলা সভানেত্রী শুচিস্মিতা দেবশর্মা, হিতেন বর্মন, অর্ঘ্য রায়প্রধান, আব্দুল জলিল আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে হিপ্পি বলেন, ‘আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সমস্ত বুথ, অঞ্চল, ব্লক এবং জেলা স্তরের সমস্ত শাখা সংগঠনের কনভেনশন শেষ করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকব। এসআইআর নিয়ে কোনও শক্তি প্রয়োগ করা হলে আমরা যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’
সভার সুর চড়তে শুরু করে উদয়ন ভাষণ দিতে আসায়। মন্ত্রী বলেন, ‘দলের জেলা সভাপতি, চেয়ারম্যানের কাছে আমার আবেদন- অনেক অঞ্চল সভাপতি আছেন, ব্লক সভাপতিও থাকতে পারেন, সন্ধ্যার পরে তাঁরা যখন চলাফেরা করেন, নর্দমাটা তাঁদের কাছে রাস্তার উপরে উঠে যায়। এইসব লোককে সামনে রেখে বা এঁদের নেতৃত্বে মানুষের কাছে ভোট চাইতে গেলে বাড়ার থেকে আমাদের ভোট আরও কমে যাবে। এঁদের নিয়ে জেলা সভাপতিকে ভাবতে হবে।’ উদয়ন বলেন, ‘জেলার নেতাকে ঠিক করতে হবে যে কুকুর লেজ নাড়াবে, না লেজ কুকুরকে নাড়াবে। এটা কিন্তু এখন পরিষ্কার হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, জেলা পরিষদের সভাধিপতি, বিধায়ক, মন্ত্রী এঁরা দল চালাবেন, না দল এঁদের চালাবে? পুরসভার চেয়ারম্যান এঁদের দিয়ে দল চালাবে?’ তাঁর কথায়, ‘দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও না প্রধানের উপর, না পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির উপর, না বিশেষ করে কয়েকটি পুরসভার চেয়ারম্যানদের উপর জেলা পার্টির কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁরা নিজের খুশিমতো চলছেন।’
এরপর রবিকে কার্যত সরাসরি কটাক্ষ করে উদয়ন বলেন, ‘দলের জেলা সভাপতি দিনরাত পার্টির জন্য ঝাঁপাচ্ছেন, কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ আছেন প্রয়োজন নেই, বাজিমেলার দোকান করছেন। সেটার ছবি তুলে পোস্ট করছেন। আমি তো কোচবিহার পুরসভার ২, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলারকে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাব, যে তাঁরা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। আজকে আমাদের সামনে যখন এরকম সংকট বন্যা, বিজেপির সঙ্গে লড়াই, তখন আমরা জুবিন গর্গের মূর্তি কোথায় বসবে, কীভাবে বসবে সেসব নিয়ে চর্চা করছি। আজকে জুবিন গর্গ কি আমাদের কাছে বড়, আমরা কি কোচবিহারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি বসিয়েছি? আমরা কি কিশোরকুমার, মান্না দে এঁদের মূর্তি বসিয়ে তারপরে জুবিন গর্গের মূর্তি বসানোর কথা ভেবেছি? আমরা তো তা ভাবিনি। এগুলো আমাদের ভাবার সময় এসেছে। আমরা কাকে নেতা বলব, কাকে নেতা বলব না, সেগুলি এখন আমাদের চিন্তা করার সময় এসেছে।’
রবীন্দ্রনাথ ঘোষ অবশ্য পালটা বলেন, ‘ওঁর যদি এসব বিষয় বোঝার ক্ষমতা থাকত তাহলে এধরনের মন্তব্য করতেন না। আমি যা করছি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই করছি। বন্যাত্রাণও আমরা দিয়েছি। আমি নিশ্চয়ই কমল গুহর মূর্তি বসাব না। ওঁর ভাবনায় কিছু হবে না। যা ভাববার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাববেন। উনি নিজের ভাবনাটা ভাবুন, তাতেই ওঁর মঙ্গল।’
