Cooch Behar | ডাক্তারি পড়ানোর নামে রমরমিয়ে ভুয়ো চক্র! কোচবিহারের বিতর্কিত হোমিওপ্যাথিক কলেজ বন্ধের নির্দেশ

শিক্ষা
Spread the love


তন্দ্রা চক্রবর্তী দাস, কোচবিহার: বৈধ নথি দেখাতে না পারায় কোচবিহারের (Cooch Behar) ঘুঘুমারির একটি বিতর্কিত হোমিওপ্যাথিক কলেজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল স্বাস্থ্য দপ্তর (Well being Division)। আগামী দু-একদিনের মধ্যেই কোচবিহারের জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারকে কলেজটি বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শচীন্দ্রনাথ সরকার।

হোমিওপ্যাথি (Homeopathy) ডাক্তারি পড়ানোর নামে দীর্ঘদিন ধরে ভুয়ো প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিযোগ উঠেছিল ‘সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ বায়োকেমিক অ্যান্ড কমপ্লেক্স হোমিও মেডিসিন উইথ রিসার্চ ইন ইন্ডিয়া’-র বিরুদ্ধে। অভিযোগ, সেখানে শুধু ডাক্তারিই পড়ানো হচ্ছে না, দেওয়া হচ্ছে ভুয়ো সার্টিফিকেটও। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথি মেডিসিন’-এর কোনওরকম অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে ওই কলেজটি চলছিল। এলাকাবাসী ও ওয়াকিবহাল মহলের অভিযোগ, সবকিছু দেখেশুনেও এতদিন ধরে চোখ বন্ধ করে ছিল পুলিশ ও প্রশাসন। ফলে দিনের পর দিন প্রতারিত হয়েছেন বহু সাধারণ ছাত্রছাত্রী, যাঁরা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছিলেন।

২০২৫-এর নভেম্বর মাসে ‘কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথি মেডিসিন’-এর তরফে এই কলেজ সম্পর্কে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে খোঁজ নিতে বলা হয়। স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশে কলেজ কর্তৃপক্ষকে সাতদিনের মধ্যে উপযুক্ত কাগজপত্র নিয়ে দেখা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কলেজের তরফে কোনও সদর্থক উত্তর আসেনি। পরবর্তীতে গত ৯ ডিসেম্বর কোচবিহার কোতোয়ালি থানায় বিষয়টি তদন্ত করার জন্য আয়ুষের ডিস্ট্রিক্ট মেডিকেল অফিসারের তরফে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠির প্রতিলিপি পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে সিএমওএইচ, হোমিওপ্যাথি মেডিসিন কাউন্সিল এবং প্রত্যেক ডেপুটি সিএমওএইচ-কে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, এরপরও কলেজ কর্তৃপক্ষ যেমন যোগাযোগ করেনি, তেমনই পুলিশের তরফেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশাসনিক কর্তার দাবি, ওই কলেজের পিছনে তৎকালীন শাসকদলের এক হেভিওয়েট নেতার মদত ছিল। সেই কারণেই পদক্ষেপ করতে প্রশাসন সাহস দেখায়নি। মাঝখানে ওই কলেজ থেকে আয়ুষের দপ্তরে কয়েকজন প্রতিনিধি এসে তথ্যপ্রমাণ পেশ করার জন্য আরও কিছু সময় চেয়ে একটি চিঠি দিয়ে যান। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাঁরা কলেজ সংক্রান্ত কোনও বৈধ কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি।

পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে গত ৩১ জুলাই কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথি মেডিসিনের রেজিস্ট্রার কোচবিহার জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে একটি চিঠি দেন। সেখানে তিনি জানান, ওই তথাকথিত কাউন্সিলটি পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্ত করছে। প্রতি বছর তারা অবৈধ ও ভুয়ো কোর্সে প্রচুর ছাত্রছাত্রী ভর্তি নিচ্ছে, যার বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। এই ধরনের কাজ শুধুমাত্র জনস্বাস্থ্য বা রোগীর সুরক্ষাকেই বিপন্ন করছে না, বরং সামগ্রিক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থারই বদনাম করছে। এর ফলে এই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর মানুষের আস্থাও নষ্ট হচ্ছে। ওই চিঠিতে অবিলম্বে স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ঘুঘুমারির ওই কলেজটি বন্ধ করতে অনুরোধ করেন রেজিস্ট্রার।

কাউন্সিল থেকে চিঠি পাওয়ার পর চলতি মাসের ১৯ তারিখ কোতোয়ালি থানার পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে আয়ুষ দপ্তরের আধিকারিকরা ওই কলেজে যান। সেখানে দেওয়ালে কাউন্সিলের পাঠানো নির্দেশিকাটি সেঁটে দেওয়া হয়। এই বিষয়ে কোচবিহারের পুলিশ সুপার মণীশ যোশির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগটি শুনেছি। সিএমওএইচ-এর কাছ থেকে নির্দিষ্ট চিঠি পেলে জেলা শাসকের নির্দেশমতো প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’

অবশেষে কলেজটি অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় স্বভাবতই খুশি কোচবিহারের প্রবীণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক অনন্ত কুণ্ডু। তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও সরকারিভাবে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। ফলে ওই কলেজ থেকে শনি ও রবিবার বহালতবিয়তে পঠনপাঠন চলছিল। কিন্তু কলেজই যখন ভুয়ো, তখন ডিগ্রিরও কোনও বৈধতা নেই। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে যাঁরা এখান থেকে ডিগ্রি লাভ করেছেন, তাঁদের পেশাগত ভবিষ্যৎ ও সমাজজীবনে ভুয়ো চিকিৎসকদের বাড়বাড়ন্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থেকেই গেল।

অন্যদিকে, কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি মঞ্জু পোদ্দারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ‘আমাদের কলেজ সম্পূর্ণ বৈধ। ১৯৯৩ সাল থেকে এই কলেজটি চলছে। আমাদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনও এক্তিয়ার হোমিওপ্যাথি মেডিসিন কাউন্সিলের নেই। এরকম কিছু হলে এর বিরুদ্ধে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।’ তবে কলেজের এই দাবির সপক্ষে তারা স্বাস্থ্য দপ্তরকে সন্তোষজনক কোনও প্রামাণ্য নথি দেখাতে পারেনি বলেই প্রশাসন সূত্রে খবর।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *