বালুরঘাট: জলকাদায় ফুটবল খেলা আর বোতল ভাঙার ডানপিটে দুরন্ত কিশোর আজ বালুরঘাটের বিধায়ক (Balurghat MLA)। ছোটবেলায় দস্যিপনার জন্য যার নামেই মেদিনীপুরের মামাবাড়ির কাচের বয়েম লুকিয়ে রাখা হত, আজ তিনিই আইনি লড়াই ও জনসেবার আঙিনা পেরিয়ে পৌঁছেছেন জননেতার আসনে, বিধানসভায়। গ্রাম সেবিকার চাকরি করা মা ললিতা রায়ের শাসন, দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে আসা বনেদি পরিবারের ঐতিহ্য, বাবার কড়া অনুশাসন এবং আড্ডাপ্রিয় স্বভাবের মেলবন্ধনে এক বর্ণময় ব্যক্তিত্ব বিদ্যুৎকুমার রায়।
তাঁর ঠাকুরদা নবকুমার রায় ১৯৪৮ সালে শান্তাহার দাঙ্গার পর ভারতে চলে আসেন। বেঙ্গল কেমিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের হাত ধরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। তবে শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। বনেদি পারিবারিক মূল্যবোধে তিনি দুই ছেলেকে বড় করেন। বড় ছেলে বা বিদ্যুতের বাবা শ্যামলকুমার রায় কৃষি দপ্তরের আধিকারিক ছিলেন। বাবার চাকরির সূত্রে বিভিন্ন জেলায় ঘুরলেও বিদ্যুতের বেড়ে ওঠা মূলত বালুরঘাটেই।
ত্রিমোহিনী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হিলি হাইস্কুলে পড়াশোনার পর তিনি বালুরঘাট (Balurghat) ললিতমোহন আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। বালুরঘাট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি অতিক্রম। কলেজ জীবনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা তাঁর ছিল প্রধান নেশা। পড়াশোনায় তার প্রভাব পড়ায় বাবা-মা তাঁকে কলকাতায় পাঠান। আইন নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইনি পাঠ শেষ করে বালুরঘাট আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু। প্রথম পাঁচ বছর কার্যত বাবার ছত্রছায়াতেই কাটে তাঁর জীবন। চেম্বার তৈরি, নামফলক, স্ট্যাম্প, পোশাক, এমনকি তাঁর পেশার প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটিও দেখভাল করতেন বাবা।
তাঁকে বিয়ে দিয়ে পরিবার মনে করেছিল সংসারের দায়িত্ব পরিণত করবে, কিন্তু বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। অবশেষে বাবার এক কড়া বকুনি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিয়মিত আইনের বই ও সাম্প্রতিক রায় পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সিভিল মামলার একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি পান। আজও তাঁর চেম্বারে ঠাকুরদাদার ব্যবহৃত কাঠের চেয়ারটি রয়েছে। বাবার দেওয়া প্রথম অ্যাটাচি, সেই সময়ের নানা নথি ও স্মৃতিচিহ্নও তিনি সংরক্ষণ করে রেখেছেন, নিজের পছন্দের চার দেওয়ালের মাঝে।
যদিও ব্যস্ত পেশাগত জীবন তাঁর আড্ডাপ্রিয় স্বভাব বদলাতে পারেনি। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি তিনি নাট্যচর্চা, খেলাধুেলা, ক্লাব এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। বাল্যবন্ধু কৃষ্ণপদ মণ্ডলের সঙ্গে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও গড়ে তোলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রক্তদান, নানা জনকল্যাণমূলক কাজ সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে নিঃশব্দে করে চলেছে।
বিদ্যুতের স্বীকারোক্তি ‘ছোটবেলায় খুব দস্যি ছিলাম। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ত্রিমোহিনীতে অনেক বয়স্ক মানুষের মুখে ছোটবেলার দুষ্টুমির গল্পই শুনেছি। সেই স্মৃতিগুলো আজও মানুষ মনে রেখেছেন, যা আমার কাছে বড় প্রাপ্তি। তবে বাবার অনুশাসন না থাকলে জীবনে এতদূর এগোতে পারতাম না। বাবার শাসনেই নিজের দায়িত্ব বুঝতে শিখেছি। জীবনের প্রতিটি ঘটনাকেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করতে শিখেছি। ভালো-মন্দ সব অভিজ্ঞতাই মানুষকে কিছু না কিছু শেখায়। সেই শিক্ষাই আমাকে গড়ে তুলেছে।’ দুরন্ত এক কিশোর থেকে প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং শেষে জনপ্রতিনিধি।

