বাঘ-পুনর্বাসন মানে নিছক একটা প্রাণীকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা নয়। এটি আসলে একটি গোটা বাস্তুতন্ত্রকে, একটা মৃতপ্রায় জঙ্গলকে পুনরুজ্জীবিত করার এক নিরলস ও ধারাবাহিক লড়াই। প্রস্তুতির ভিতটাকে পাথরের মতো মজবুত করাটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
আলিপুরদুয়ার: জঙ্গল মানে শুধু সারি সারি গাছ আর নাম না জানা পাখির কলকাকলি নয়। জঙ্গলের একটা নিজস্ব স্পন্দন থাকে, একটা বন্য সুবাস থাকে। আর বক্সার জঙ্গলে সেই স্পন্দনটাই যেন গত কয়েক বছর ধরে বড্ড ফিকে। কারণ, যে বাঘের জন্য এ জঙ্গল সেই বাঘই এখন বিবাগী। সেই শূন্যতা ঘোচাতেই এবার সাজোসাজো রব বক্সায় (Buxa)।
আগামী ২ অক্টোবর এখানে বাঘ ছাড়ার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে। চারদিকে একটা উৎসবের মেজাজ, যেন কোনও বহু প্রতীক্ষিত মেগা বাজেটের সিনেমার প্রিমিয়ার শো হতে চলেছে। নির্দিষ্ট দিনে ফিতে কাটা হবে, খাঁচার দরজা খুলবে, আর পর্দায় হুংকার দিয়ে উঠবে ডোরাকাটা আভিজাত্য। কিন্তু বাস্তবের জঙ্গল কোনও রুপোলি পর্দা নয়। বক্সার এই তড়িঘড়ি প্রস্তুতি তাই উত্তরবঙ্গের (North Bengal) পরিবেশপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এক গভীর আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। কারণ, একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘকে ট্রাঙ্কুইলাইজ করে এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে নিয়ে আসাটা প্রশাসনিকভাবে হয়তো খুব সহজ একটা কাজ। কিন্তু সেই বাঘটিকে সম্পূর্ণ এক অচেনা, নতুন পরিবেশে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখাটা তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ কঠিন। আর এই কঠিন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েই বক্সার সামনে আজ এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলছে। বক্সা কি রাজস্থানের ‘সরিস্কা’ হয়ে এক নতুন রূপকথা লিখবে, নাকি ওডিশার ‘সাতকোশিয়া’র মতো এক চরম মর্মান্তিক ব্যর্থতার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে?
বক্সায় বাঘ ছাড়ার আগে ভারতের বাঘ-পুনর্বাসনের এই দুটি অতীত ইতিহাসের পাতা উলটে দেখাটা খুব জরুরি। প্রথমটি ওডিশার সাতকোশিয়া ব্যাঘ্র-প্রকল্প। সালটা ২০১৮। মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) কানহা থেকে আনা হয়েছিল এক পেল্লায় বাঘ, নাম তার ‘মহাবীর’। আর বান্ধবগড় থেকে আনা হয়েছিল এক বাঘিনী, নাম ‘সুন্দরী’। বিপুল অর্থব্যয়, প্রবল জাঁকজমক আর ঢাকঢোল পিটিয়ে তাদের সাতকোশিয়ায় ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু ফল কী হল? প্রশাসনের সেই জাঁকজমক কয়েক মাসের মধ্যেই এক বিষাদসিন্ধুতে পরিণত হল। চোরাশিকারিদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে চরম যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে প্রাণ হারাল মহাবীর।
অন্যদিকে, স্থানীয়দের সঙ্গে সুন্দরীর শুরু হল এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আতঙ্কিত গ্রামবাসীর রোষের মুখে পড়ে সুন্দরীকে শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে খাঁচাবন্দি করা হয় এবং একরাশ ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় নিয়ে তাকে ফের মধ্যপ্রদেশেই ফেরত পাঠাতে হয়। এই চরম বিপর্যয়ের গভীরে লুকিয়ে ছিল একটা মস্ত বড় ফাঁক, স্থানীয়দের প্রবল আস্থাহীনতা। জঙ্গল ঘেঁষা গ্রামের মানুষদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও অস্তিত্বকে বিপন্ন করে, কেবল তড়িঘড়ি একটা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চমক দেওয়ার মাশুল সেবার সাতকোশিয়াকে এভাবেই কড়ায় গন্ডায় চোকাতেও হয়েছিল।
এই মর্মান্তিক গল্পের ঠিক উলটো পিঠে রয়েছে এক অবিস্মরণীয় সাফল্যের আখ্যান, যার নাম রাজস্থানের সরিস্কা ব্যাঘ্র-প্রকল্প। ২০০৫ সালে যখন হঠাৎ করে খবর এল যে সরিস্কায় একটাও বাঘ আর অবশিষ্ট নেই, তখন গোটা বিশ্বজুড়ে তীব্র তোলপাড়। এরপর অনেক ভাবনাচিন্তা, অনেক লড়াই। ২০০৮ সালে মাত্র তিনটি বাঘ দিয়ে সেখানে এক নতুন পুনর্বাসন প্রকল্প শুরু হয়। আর আজ? আজ সেই সরিস্কায় বাঘের সংখ্যা ৫৬-র গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের জাদুকাঠিটা কিন্তু কোনও জাদুকরের হাতে ছিল না? তা লুকিয়ে ছিল সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যে। প্রশাসন সেখানে কোনও জোরজুলুম করেনি। বরং বনাঞ্চল লাগোয়া সাধারণ বাসিন্দাদের এই মহতী প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশীদার করে তুলেছিল। গ্রামবাসীদের বোঝানো হয়েছিল, বাঘ বাঁচলে জঙ্গল বাঁচবে, আর জঙ্গল বাঁচলে তাঁদের রুটিরুজিও সুরক্ষিত হবে। বাঘের জন্য পর্যাপ্ত শিকার এবং নিরাপদ বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে প্রশাসন সেখানে দীর্ঘ সময় নিয়েছিল, কোনও তাড়াহুড়ো করেনি।
বক্সার ক্ষেত্রেও এখন সেই একই অগ্নিপরীক্ষা। একসময়ের বাঘেদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র বক্সায় আজ আর স্থায়ী বাঘের কোনও দেখা মেলে না। সুন্দরবনের বাঘ যেহেতু ম্যানগ্রোভ পরিবেশে, কাদা-জলে অভ্যস্ত, তাই বক্সার পাহাড়, নদী আর তরাই অঞ্চলের জন্য বিহারের বাল্মীকি অথবা অসমের কাজিরাঙ্গা থেকে বাঘ আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় এটাই যে, এবার অন্তত সাতকোশিয়ার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ বন দপ্তর। বাঘ আনার আগে জঙ্গলে তার মূল শিকার অর্থাৎ চিতল ও সম্বর হরিণের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। নতুন ঘাসবন তৈরি করা হচ্ছে। কারণ জঙ্গলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে বাঘ পেটের দায়ে নিশ্চিতভাবেই লোকালয়ে ঢুকবে, আর তখনই শুরু হবে মানুষ-পশুর সেই আদিম সংঘাত।
পাশাপাশি, মানুষ ও বন্যপ্রাণী সংঘাত এড়াতে জঙ্গল লাগোয়া জনবসতি সরানোর কাজ চলছে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে। ইতিমধ্যে ভুটিয়া বস্তি ও গাংগুটিয়া বনবস্তির বাসিন্দাদের সফলভাবে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। জয়ন্তী গ্রামের মতো বড় জনপদের ৯৭ শতাংশ পরিবারও অন্যত্র সরতে স্বেচ্ছায় রাজি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে, ভিনরাজ্য থেকে আনা বাঘেদের সরাসরি গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তার বদলে একটি বিশাল প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে বা সফট রিলিজ পদ্ধতিতে তাদের প্রথমে বেশ কিছুদিন রাখা হবে। নতুন পরিবেশ, এখানকার হাওয়া, জল, গন্ধের সঙ্গে মানিয়ে নিলে তবেই তাদের পুরোপুরি মুক্ত করা হবে বক্সার বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে।
আসলে বাঘ-পুনর্বাসন মানে নিছক একটা প্রাণীকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা নয়। এটি আসলে একটি গোটা বাস্তুতন্ত্রকে, একটা মৃতপ্রায় জঙ্গলকে পুনরুজ্জীবিত করার এক নিরলস ও ধারাবাহিক লড়াই। তাই কোনও প্রশাসনিক চমক দিতে ২ অক্টোবরের ডেডলাইন ছোঁয়ার চেয়ে, প্রস্তুতির ভিতটাকে পাথরের মতো মজবুত করাটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। বক্সা যদি সাতকোশিয়ার সেই একগুঁয়েমি আর তাড়াহুড়ো এড়িয়ে সরিস্কার মতো স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস আর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে, তবে উত্তরবঙ্গের এই চিরসবুজ জঙ্গলে খুব শীঘ্রই ফের লেখা হবে এক নতুন বন্য রূপকথা। আর সেই রূপকথায় বক্সার বুক চিরে ফের শোনা যাবে সেই বহু প্রতীক্ষিত রাজকীয় গর্জন।

