লাউড অভিনয়কে বিশ্বাসযোগ্য করেছিলেন 

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


রাগ, তীব্র সংলাপ, নীরবতা আর মঞ্চের অভিজ্ঞতায় নানা পাটেকর তৈরি করেছিলেন নিজের অভিনয়ভাষা।

কল্যাণময় দাস

একবারই তাঁর খুব কাছে যাবার সুযোগ হয়েছিল মুম্বইয়ে। ১৯৮৯ সনে মুম্বইয়ের ভিলে পার্লে। দীননাথ মঙ্গেশকর নাট্যগৃহ। বাবার সঙ্গে ‘পুরুষ’ নাটক দেখতে গিয়েছি। মুম্বই ভ্রমণে বাবার বরাবরের আগ্রহ ছিল মারাঠি নাটক দেখতে হবে। ‘পুরুষ’–এ নানা পাটেকরের চরিত্র ভিলেনের। তিনি দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে নাটকটি করেছিলেন। চরিত্রের নাম গুলাবরাও যাদব। প্রায় দু’ঘণ্টা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসিয়ে রাখল আমাদের। মারাঠি ভাষা আর বাংলা ভাষা অনেকটা কাছাকাছি। শুধু উচ্চারণেই যা আলাদা হয়ে যায়। নাটক বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি। নাটক শেষে গ্রিনরুমে আমরা নানার মুখোমুখি। বাবার এক বন্ধুও ছিলেন, যিনি মুম্বই প্রবাসী। তিনি তখন মেকআপ তুলছিলেন। তাঁর মধ্য দিয়ে নানা পাটেকরের সঙ্গে কথা শুরু হয়। আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছি শুনে যেটা বললেন, সেটা আজও আমার কানে বাজে, ‘তু তো খুশ কিসমত হ্যায়, বাঙ্গাল মে পয়দা হুয়ে হো’।

একজন মানুষ কখনও রাগি, কখনও প্রেমিক, কখনও ক্লান্ত, কখনও প্রচণ্ড নিষ্ঠুর, কখনও স্বপ্নদর্শী, আবার কখনও ভীষণ একা। নাট্য অভিনেতা, চলচ্চিত্র অভিনেতা, সমাজসেবক, স্পষ্টবক্তা নানা পাটেকর চলে গেলেন পঁচাত্তর বছর বয়সে। বৃহস্পতিবার গোয়ায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পাঁচ দশকেরও বেশি দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অবসান ঘটল এদিন। একজন অভিনেতার পঁচাত্তর বছরে চলে যাওয়া, আর তাঁর জন্য নাগরিক সমাজে হাহাকার ওঠা, তাঁর জনপ্রিয়তার প্রকাশ সোশ্যাল মিডিয়াতেও স্পষ্ট।

সিনেমা ব্যাখ্যাতারা বলেন, সিনেমায় লাউড অভিনয় ভালো লাগে না, সেটা মেকি মনে হয়। কিন্তু আমরা প্রায় পাঁচ দশক ধরে দেখলাম এমন একজন মানুষকে, যিনি সিনেমা পণ্ডিতদের সেই তথাকথিত ব্যাকরণকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে একটা অনবদ্য অভিনয়শৈলী তৈরি করলেন। হিন্দি আর মারাঠি মঞ্চের শক্তিশালী অভিনেতা। চলচ্চিত্রের নায়ক, অথচ চরিত্রাভিনেতা। নানা পাটেকর।

তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি, তিনি চরিত্রকে শুধু সংলাপ, পোশাক কিংবা বাহ্যিক আচরণ দিয়ে তৈরি করেন না। চরিত্রের ভিতরের দ্বন্দ্ব, ক্ষত, অপমান, ভালোবাসা, অসহায়তা, অস্থিরতাতেই তাঁর অনুসন্ধান। তাঁর লাউড অথচ আকর্ষণীয় অভিনয়শৈলীতে আমাদের কৈশোর ও যৌবন চমকে উঠেছিল। আশির দশকের শেষ আর নব্বইয়ের দশকে আমাদের মতো তরুণের চোখের সামনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ‘পরিন্দা’র আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ‘আন্না শেঠ’-এর চরিত্র দিয়ে তিনি যে শিহরণ তৈরি করেছিলেন, তা অবিস্মরণীয়। চোখের স্বল্প চাহনি আর বিস্ফোরক সংলাপে তাঁর তীব্র চাপেই বুঝে গিয়েছিলাম, ভিন্ন স্বাদের এক নতুন অভিনেতা এসেছেন। তার আগেই অবশ্য ‘অঙ্কুশ’, ‘সালাম বোম্বে’তে একজন সু-অভিনেতাকে পেয়েছিলাম।

নানার কণ্ঠস্বর তাঁর অস্ত্র। সংলাপে বিরতির ব্যবহার তাঁকে আমজনতার খুব কাছে নিয়ে এসেছিল। নানা পাটেকরের উচ্চারণের আসল ম্যাজিক শব্দে যতটা, তার চেয়েও বেশি উচ্চারণের ভঙ্গিতে। মৃদু মারাঠি অ্যাকসেন্টে হিন্দি উচ্চারণে কোথায় থামছেন, কোথায় শব্দ চেপে দিচ্ছেন, আর কখন হঠাৎ বিস্ফোরিত হচ্ছেন। বেশির ভাগ অভিনেতা সংলাপ বলেন। আর অসাধারণ অভিনেতারা সংলাপকে বাস্তব করে তোলেন। নানা পাটেকর দ্বিতীয় দলের।

রাগ, সংযম, হাস্যরস আর মাটির গন্ধের মিশেলে নানা চরিত্রটি হয়ে ওঠেন। পর্দার নানা পাটেকর চরিত্রের মুখোশ সরিয়ে মানুষের দুর্বলতাকেই সামনে আনেন। চরিত্রটি তাঁর ভিতরেই কোথাও আগে থেকে বসে আছে বলে মনে হয়। ক্যামেরা শুধু সেই মানুষটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর অভিনয় দেখার পর অনেক সময় সংলাপ মনে থাকে না। থেকে যায় মুখ, দৃষ্টি, মুহূর্ত। আবার কখনও তাঁর বিরাট বিরাট সংলাপ মানুষ মুখস্থ করে ফেলে। সেসব আড্ডায় উচ্চারণ করেন মানুষ, প্রেমিকাকে মনে করে বলেন, ‘ক্যায়সে বাতায়ুঁ ম্যায় তুমহে, মেরে লিয়ে তুম কৌন হো’, অথবা সমাজের নানা কিছুকে শ্লেষে বলে ওঠে, ‘এক মচ্ছর আদমিকে হিজড়া বনা দেতা হ্যায়’। নানা পাটেকরের সংলাপ মানুষের আবেগের ভাষা হয়ে আছে।

তাঁর নাম উঠলেই অনেকের মনে আসে রাগের দৃশ্য। উঁচু গলা, তীব্র সংলাপ, চোখের ভিতরের বিদ্যুৎ, এসব তাঁর পরিচিত উপাদান। অথচ তাঁর অভিনয় একই ভঙ্গির পুনরাবৃত্তিতে আক্রান্ত হয়নি। তিনি পরিশ্রম না করে কোনও চরিত্রেই অভিনয় করতেন না। চরিত্র নির্মাণ সম্পর্কে তাঁর একটি বিখ্যাত কথা, ‘আমি চামড়া ভেদ করে চরিত্রের আত্মার ভিতরে ঢুকে যাবার চেষ্টা করি।’ তাই তাঁর রাগ কখনও একমাত্রিক হয় না। সেই রাগের নীচে থাকে অপমান, অসহায়তা, ক্ষোভ, ব্যর্থতা কিংবা ভালোবাসা। প্রেমিক মল্লারের সেই মঞ্চদৃশ্যটির কথা ভাবুন তো। কী অসামান্য কাজ!

‘প্রহার : দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ নানা পাটেকরের পরিচালনায় তৈরি এবং তিনি গল্প ও চিত্রনাট্যেরও অন্যতম রচয়িতা। নব্বইয়ের দশকে এই সিনেমাটি সময়ের চাইতে এগিয়ে ছিল বলে আমার মনে হয়। সিনেমায় শার্লি নামের একটি চরিত্রে মাধুরী দীক্ষিত। তখন মাধুরী দীক্ষিত বেশ নামি নায়িকা। ফলে তাঁর ‘হিরোইন ভেইন’ তাঁকে নায়িকার মতোই সাজিয়ে তুলেছিল। কিন্তু নানা পাটেকর সেটা ডিনাই করলেন। কথাকাটাকাটি হল। নানা ব্যাকস্টোরি ও বিশ্লেষণ করে বোঝালেন, কেন হিরোইনের মতো মেকআপ করা যাবে না। অবশেষে মাধুরী মানলেন। আমরা পেয়ে গেলাম এক অনবদ্য শার্লি, একদম সাধারণ অথচ আকর্ষণীয় একজন প্রেমিকা, যে তার নিজের চেনা পরিমণ্ডলেই জওয়ান প্রেমিককে নিয়ে জীবনযাপন করতে চায়। এই ছিলেন নানা পাটেকর।

এটাই নানা পাটেকরের পরিচালক সত্তা ও অভিনয়ের বিশেষত্ব। তিনি খারাপ মানুষকেও খারাপ করে তোলেন না। আবার সুন্দরী নায়িকাকেও শুধুই অপ্রয়োজনীয় স্বপ্নের নায়িকা করে রাখেন না। ভালো মানুষকেও নিখুঁত রাখেন না। তাঁর চরিত্ররা ভুল করে, রাগে, ভেঙে পড়ে, কখনও নিজেদের কাছেই হেরে যায়।

‘ক্রান্তিবীর’-এ নানা পাটেকরের অভিনয় তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ। সেই ছবির সংলাপ, শরীরী ভাষা, বিস্ফোরক আবেগ, গর্জন, সবই দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের শক্তি শুধু সেই গর্জনে নয়, গর্জনের ঠিক আগের মুহূর্তটাতেও। তিনি জানতেন কখন সংলাপ ছুড়ে দিতে হয়, আর কখন কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলেই দৃশ্যটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাগের অভিনয় করতে শুধু গলা চড়ালেই হয় না, উৎসটাও বুঝতে হয়। নানা সেই উৎসের কাছেই পৌঁছাতেন প্রতিটি চরিত্রে। ফলে তাঁর ক্রোধ কখনও নিছক নাটকীয়তা হয়ে দাঁড়ায় না। তার মধ্যে থাকে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং সামাজিক ক্ষোভ, দুটোই।

নানা পাটেকরের অভিনয়কে বুঝতে গেলে তাঁর থিয়েটারের অভিজ্ঞতার কথা আসবেই। মঞ্চ অভিনেতাকে শরীর, কণ্ঠ, ছন্দ ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে শেখায়। দর্শক সামনে বসে থাকে, কোনও ক্লোজআপ নেই, কোনও এডিটিং নেই। অভিনেতাকেই শরীর ও কণ্ঠ দিয়ে মুহূর্তটি তৈরি করতে হয়। নানা সেই শিক্ষাকে পর্দায় নিয়ে এসেছেন। তাঁর অভিনয়ে থিয়েটারের ভার অতিরিক্ত হয়ে ওঠে না। দৃশ্যকে বড় করেন, আবার প্রয়োজন ফুরোলেই নিজেকে সরিয়ে নেন। এই নিয়ন্ত্রণটাই তাঁকে আলাদা করে।

পর্দার বাইরের নানাকে বুঝতে গেলে তাঁর সরল জীবনযাপনও চোখে পড়ে। খ্যাতি তাঁকে শহুরে তারকাসুলভ জীবনযাপনের দিকে খুব একটা টেনে নিয়ে যায়নি। কৃষিকাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, মাটির কাছাকাছি থাকার অভ্যাস ও অনাড়ম্বর যাপন তাঁকে অন্য তারকার থেকে আলাদা করে। নানা পাটেকরকে দেখলে ‘স্টার’ শব্দটার চেয়ে ‘অভিনেতা’ শব্দটাই বেশি মানায়। কারণ তারকাখ্যাতির যে দূরত্ব তৈরি হয়, সেটাকে তিনি খুব একটা প্রশ্রয় দেননি। তাঁর ব্যক্তিত্বেও সেই ছাপ আছে, সোজাসাপ্টা, কখনও তীক্ষ্ণ, কখনও অস্বস্তিকর রকম স্পষ্ট।

সেই কারণেই তাঁর জনপ্রিয়তার সঙ্গে একটা অদ্ভুত বিশ্বাসযোগ্যতা জড়িয়ে থাকে।

(লেখক নাট্যশিল্পী।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *