সময় নেই আদালতের, রক্ত ঝরছে রাজপথে

সময় নেই আদালতের, রক্ত ঝরছে রাজপথে

শিক্ষা
Spread the love


শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে পথে নামা রক্তাক্ত পড়ুয়াদের ভিডিও দেখার ‘সময় নেই’ বলে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, দেশের যুবসমাজের মনে বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

নীহারিকা সরকার

দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সংবিধানের শেষ রক্ষাকর্তা এবং সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাতেই যদি বলা হয়, ‘আপনাদের ওইসব ভিডিও দেখার মতো সময় আমাদের নেই’, তবে দেশের যুবসমাজ কার দরজায় গিয়ে দাঁড়াবে? ২২ জুলাই ঠিক এই কথাটিই শোনা গেল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মুখে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব দুর্নীতির প্রতিবাদে দেশের ছাত্রসমাজ যখন ‘চলো সংসদ’ অভিযানের ডাক দিয়ে দিল্লির রাজপথে পুলিশের লাঠির ঘায়ে রক্তাক্ত হচ্ছে, তখন সেই পুলিশি পদক্ষেপের ভিডিও প্রমাণ দেখতে অস্বীকার করল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তবের রাজপথের এক অনভিপ্রেত দূরত্বেরই ইঙ্গিতবাহী। যে ছাত্ররা দেশের ভবিষ্যৎ, যারা একটি দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে নিজেদের রক্ত ঝরাচ্ছে, তাদের আর্তি শোনার সময় যদি আদালতের না থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি করে। এই প্রশ্ন আজ গোটা দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবারের ‘চলো সংসদ’ অভিযানকে কেন্দ্র করে। দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিরাট শিক্ষা কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, তার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে যুবসমাজ। সেই মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং নির্বিচার ধরপাকড়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে জরুরি শুনানির আর্জি জানানো হয়েছিল। আবেদনকারীদের আইনজীবী যখন পুলিশি হামলার মর্মান্তিক ভিডিও প্রমাণ হিসেবে পেশ করতে চান, তখন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত চরম বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁরা ওইসব ভিডিওতে আগ্রহী নন এবং তাঁদের কাছে ওইসব দেখার মতো সময় নেই। তিনি আইনজীবীদের সতর্ক করে বলেন যে তাঁরা যেন আদালতের সময় নষ্ট না করেন। এই মন্তব্যটি স্বভাবতই আগুনে ঘি ঢেলেছে। দেশের সর্বোচ্চ বিচারপতির এই অনীহা প্রমাণ করল যে, প্রাতিষ্ঠানিক এজলাসের ঘেরাটোপের সঙ্গে বাস্তবের রাজপথে রক্ত ঝরানো সাধারণ মানুষের মানসিক দূরত্ব ক্রমশই বাড়ছে। দেশের যুবসমাজ যখন বিচারের আশায় শীর্ষ আদালতের দিকে তাকিয়ে, তখন আদালতের এই সময়-সংকট আসলে গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই এক চিন্তার বিষয়।

এই হতাশার আঘাত আরও গভীরে বিঁধেছে কারণ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে এই তরুণ প্রজন্মের একটি পুরোনো প্রসঙ্গের ছায়া জড়িয়ে রয়েছে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, মে মাসেই সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানিকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচার ব্যবস্থার সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। বেকার তরুণদের একাংশকে তিনি ‘সমাজের পরজীবী’ এবং ‘আরশোলা’ বা ককরোচ বলে কটাক্ষ করেন বলে অভিযোগ ওঠে, যার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও পরে তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাঁকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং তিনি কেবল ভুয়ো ডিগ্রিধারীদের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। তাঁর সেই মন্তব্যকে হাতিয়ার করেই সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নেয় এক অভিনব ও ব্যঙ্গাত্মক ছাত্র আন্দোলন—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘সিজেপি’। আজ সেই তরুণদের আন্দোলনের ওপর যখন পুলিশি পদক্ষেপ নামল, তখন সেই একই বিচারপতির ‘সময় নেই’ বলে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটাকে কোনওভাবেই কাকতালীয় বলে মানতে নারাজ বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ।

আজ ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের যুগে কোনও কিছুই আর চার দেওয়ালের মাঝে বন্দি থাকে না। প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ক্ষোভের সুনামি আছড়ে পড়েছে। ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মী—সকলেই এই প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্বের কড়া সমালোচনা করছেন। নেটিজেনদের একাংশ সেই পুরোনো মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষুব্ধ তরুণদের একাংশ এমন সব কড়া মন্তব্য করছেন, যা বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। ডিজিটাল ক্যাম্পেনে লেখা হচ্ছে—‘সুপ্রিম কোর্টের যদি দেশের যুবসমাজের জন্য সময় না থাকে, তবে যুবসমাজেরও আদালতের ওপর ভরসা রাখা কঠিন।’

তবে, এই হতাশার আবহের মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট যখন সময়ের অভাবের কথা বলেছে, তখন দিল্লি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিকে উপাধ্যায়ের বেঞ্চ কিন্তু এই পুলিশি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছে। একাধিক জনস্বার্থ মামলার ভিত্তিতে দিল্লি হাইকোর্ট সরাসরি দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি চেয়েছে। সোমবারের ঘটনার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও রেকর্ডিং সযত্নে সংরক্ষণ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতে যখন পুলিশের বিরুদ্ধে পেরেক লাগানো লাঠি ব্যবহারের মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠছে, তখন কেন্দ্রীয় সরকার জনস্বার্থ মামলাগুলোকে স্রেফ ‘প্রচার পাওয়ার সস্তা চেষ্টা’ বলে দাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট তাদের সেই যুক্তি কার্যত উড়িয়ে দিয়ে পালটা প্রশ্ন করেছে যে, এত বড় একটা ঘটনাকে কীভাবে প্রচারের আলো কাড়ার চেষ্টা বলা যেতে পারে? প্রতিটি ছাত্র কি আলাদাভাবে গিয়ে এফআইআর দায়ের করবে? দিল্লি হাইকোর্টের এই সংবেদনশীল অবস্থান প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে আইনি ব্যবস্থা সত্যিই সাধারণ মানুষের ঢাল হয়ে উঠতে পারে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক এবং আইনি মহলেও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। খোদ সুপ্রিম কোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিকাশ সিং এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন। তিনি দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করার দাবিও তুলেছেন। অর্থাৎ, আইনি মহলের একাংশও মনে করছে যে পুলিশের এই বর্বরোচিত পদক্ষেপ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অন্যদিকে, প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ জহর সরকার মন্তব্য করেছেন যে, পুলিশি হামলার ভিডিও যদি স্বয়ং প্রধান বিচারপতি দেখতে না চান, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। শিবসেনা (উদ্ধব) গোষ্ঠীর সাংসদ সঞ্জয় রাউতও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের সুরে তরুণদের জাগিয়ে তোলার জন্য প্রধান বিচারপতিকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন।

আজ দেশের যুবসমাজ যখন তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্নীতির হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদে রাস্তায় নেমে মার খাচ্ছে, তখন সর্বোচ্চ আদালতের এই ‘সময় নেই’ তত্ত্ব সমাজকে এক ভুল বার্তা দিচ্ছে। বিচার ব্যবস্থা যদি সাধারণের যন্ত্রণা থেকে যোজন দূরে অবস্থান করে, তবে সেই বিচারের বাণী শেষপর্যন্ত নীরবে নিভৃতে কাঁদে। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন একটি প্রজন্মের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, ঠিক তেমনি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে আস্থার অভাব গোটা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। দেশের যুবসমাজ আজ সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়িয়েছে। শীর্ষ আদালতের একটি সংবেদনশীল পদক্ষেপ হয়তো এই তরুণদের বুকে অনেকখানি ভরসা জোগাতে পারত।

(লেখক সমাজতত্ত্ববিদ)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *