প্রকৃতির সর্বগ্রাসী রূপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, উত্তর নেপালে রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশী নদীর বান তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। একাধিক প্রাণহানি, সম্পত্তির বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, তিব্বত সীমান্তে রাসুয়াগড়ির ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ ভেসে যাওয়া, নেপালের মোট ক্ষমতার ১২ শতাংশেরও বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সহ এই প্রবল দুর্যোগে ভারতের বিহার এবং উত্তরপ্রদেশে চরম সতর্কতা জারি- ইত্যাদিতে মহাবিপর্যয়ের মুখে বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
নদীর উত্তাল স্রোতে তাসের ঘরের মতো বাড়ি ভেঙে পড়া, খড়কুটোর মতো সেতু যানবাহন, বসতবাড়ি ভেসে যাওয়া আর মানুষের আর্তনাদ শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার কোলাজ হয়ে রইল না। বরং প্রকৃতির ওপর মানবসভ্যতার বেপরোয়া কার্যকলাপ এবং সংবেদনশীল পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রে অবৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ফলে নির্মম পরিণতি বুঝিয়ে দিল।
তিব্বত সীমান্ত পেরিয়ে নেপাল ভূখণ্ডের রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশী নদীতে হঠাৎ জলস্ফীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টিপুরে ও শ্যাপ্রু বেসি অঞ্চল। টিপুরে বাজারের শুল্ক দপ্তর চত্বর সম্পূর্ণ ভেসে গিয়েছে। তিব্বত ও নেপালের বাণিজ্যিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এবং গত বছরের ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন করে নির্মিত রাসুয়াগড়ির ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজটি আবার ভেসে গিয়েছে। টিপুরের পুলিশ কার্যালয়, শ্যাপ্রু বেসি পুলিশ পোস্ট এবং রাসুয়াগড়ির পুলিশ পোস্টের পরিকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমাজমাধ্যমে কাদামাটি মেশা জলের স্রোতের হুড়মুড়িয়ে নেমে আসা আর চোখের নিমেষে সবকিছু ভেসে যাওয়ার ভাইরাল দৃশ্য শিউরে ওঠার মতোই। এই বিপর্যয়ের কারণ ঘিরে নানা মত শোনা যাচ্ছে। নেপালের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, রাসুয়া অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি যা এই ধরনের প্রলয়ংকর প্লাবন ঘটাতে পারে। তবে উপগ্রহচিত্রে তিব্বতে ব্যাপক বর্ষণ এবং হিমবাহজাত হ্রদ বিস্ফোরণের স্পষ্ট সংকেত মিলেছে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের দৌলতে হিমালয়ের উঁচুতে জমতে থাকা সুপ্রাগ্লেসিয়াল হ্রদগুলি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। বরফের বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার কিউসেক জল আচমকা নীচে নেমে এলে তার গতিরোধ অসম্ভব। গত বছর ঠিক একই নদীর অববাহিকায় তিব্বতের হ্রদ উপচে পড়া জলে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং সংযোগকারী সেতু ধ্বংস হয়েছিল।
এক বছরের মাথায় একই দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আর দূরবর্তী হুমকি নয়, বরং মানবসমাজের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে। প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের নেপথ্যে শুধু জলবায়ুর পরিবর্তনকে দায়ী করাটা একধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। আসল সংকট লুকিয়ে আছে মানুষের তথাকথিত উন্নয়নের ভাবনায়।
হিমালয় অত্যন্ত নবীন ও ভঙ্গুর পার্বত্য অঞ্চল। অথচ গত কয়েক দশকে পর্যটন, বাণিজ্যিক প্রসার এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপে এই অঞ্চলে যে অনিয়ন্ত্রিত এবং অপরিকল্পিত পরিকাঠামো নির্মিত হয়েছে, তা পরিবেশবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানোর নামান্তর। পাহাড়ের গায়ে ডিনামাইট ফাটিয়ে টানেল খোঁড়া, বাঁধ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করা এবং নদীগর্ভে বহুতল ও সড়ক নির্মাণের লাগামহীন প্রতিযোগিতা নদীর আত্মরক্ষার স্বাভাবিক পথকে সংকুচিত করে দিয়েছে।
এই দুর্যোগ আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের চরম অভাবকেও পুনরায় চিহ্নিত করল। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতেকোশী নদী নেপালে ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিশে ভারতের বিহারে গণ্ডক নামে বয়ে গিয়েছে। ফলে তিব্বত, নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খাঁড়া ভারতে নামতে বাধ্য। অথচ চিন, নেপাল এবং ভারতের মতো আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি করা দেশগুলির মধ্যে রিয়েল টাইম তথ্য আদানপ্রদান বা আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার কোনও শক্তপোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো কখনও গড়ে তোলা হয়নি।
যে কারণে তিব্বতের হিমবাহজাত হ্রদের পরিবর্তন বা ধসের আগাম তথ্য ভাটির দেশগুলিতে সময়মতো পৌঁছোয় না। পাহাড়ে দেদার উন্নয়নের বুলডোজার চালিয়ে পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন ছাড়া বেপরোয়া নির্মাণকাজ চলছে। অথচ উন্নয়নের ঠুলি চোখে ঝলমলে সভ্যতার অহংকার যে প্রকৃতির রুদ্ররোষের সামনে অসহায়, তা নেপাল আরও একবার দেখিেয় দিল।
The submit মহাপ্রলয় appeared first on Uttarbanga Sambad.
