(শিক্ষাঙ্গনে মতের লড়াই হোক, পেশিশক্তির প্রদর্শন নয়। এই প্রত্যাশাই আজ আমাদের সকলের।)
সেবন্তী ঘোষ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটল তা নতুন করে বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখে না। লিখিত অক্ষরের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ, মোবাইল হোক বা সিসি ক্যামেরা, এখন হেঁশেলের খবর পাওয়া জলভাত। তবে এই তথ্য পাওয়া বিষয়টি এত সহজ নয়। মিলিয়ে-মিশিয়ে এখন দিনকে রাত করে দেওয়া যায়। সত্য ও মিথ্যা এখন পোস্ট ট্রুথ ও এআই যোগে চালেডালে খিচুড়ি। রান্নার পর আপনি দুটির আলাদা স্বাদ পেলেও পৃথক করতে পারবেন না।
এগুলো আড়ালে-আবডালে ছবি থেকে যাওয়ার গল্প। কিন্তু প্রকাশ্যে, বহুজনের সামনে আপন মনের মাধুরী মেশানো বিকৃতি সম্ভব নয়। এখন ভিড়ের মধ্যে প্রত্যেকেই সচল চিত্রগ্রাহক। কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ সিনেমার মতো একটি ঘটনা বিভিন্ন কোণ থেকে আপনি অনায়াসে দেখে নিতে পারেন। ফলে বহুজনের সামনে স্থানীয় নির্বাচিত নেত্রীর উদ্ধত আস্ফালনে যা ঘটেছে, তার ভিতরে এলাকা দখলের লড়াইটি বাহ্যিকভাবে চোখে পড়েছে। কিন্তু রাজায় রাজায় যুদ্ধে উৎপাটিত হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মারক চিহ্নটি। যেটির নকশা করেছিলেন স্বয়ং শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু। এই স্মারক চিহ্নটি ভেঙে ফেলল ছাত্র নামধারী দেশের তথাকথিত ঐতিহ্যরক্ষাকারীরা। দেশীয় চিত্রকলা রক্ষণে সবার ওপরে যদি কারও নাম আসে, তবে সেটি নন্দলাল বসুর। ভারতের সংবিধানের মূল কপিটিতেই হোক বা সহজপাঠের চিত্রাঙ্কনে, শিল্পাচার্য সর্বত্র তাঁর অনন্য সৃষ্টির স্বাক্ষর রেখেছেন।
আমরা একাধিকের তোলা ভিডিওয় দেখেছি নেত্রীর উসকানিতে মারমুখী ছাত্রদল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট টপকে বা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেছে। তারা যে উলটোপক্ষের ছাত্রদের শিক্ষা দিতে গিয়ে নন্দলাল বসুর শিল্পকর্মটি ভাঙবে মনস্থ করেছিল এমনটা মনে হয় না। বলা যায় এই স্মারকচিহ্নটি বিষয়ে তাদের কোনও জ্ঞানই ছিল না। অজ্ঞানতা মূল্যবান বস্তুর মূল্য বোঝে না। গড়ার চেয়ে ভাঙা সহজ। আর একবার ভাঙতে শুরু করলে হাতের সামনে যা পাওয়া যায়, তা পেটাতে ভারী সুখ।
দুই বিরোধী ছাত্রদল হাতাহাতি সংঘর্ষে নয়, রাজনৈতিক বোধের তর্কে প্রবৃত্ত হবে, এ যেন আশার অতীত। আমরা ভাবতাম বর্তমান সরকারের যে দল, তা সংঘবদ্ধ, বিশেষ ক্যাডারে সমৃদ্ধ। নিজস্ব মতামত তাদের তীব্র। আগের সরকারের মতো, ‘আমরা সবাই রাজা, আমাদেরই রাজার রাজত্বে’ -এমন বোধ এদের থাকার কথা নয়। সেখানে গায়ের জোরের বদলে তর্কযুদ্ধ বাঞ্ছনীয় ছিল। এক সময় শিক্ষা আমাদের সেই হাতিয়ার দিয়েছিল। অসিকে মসীর চেয়ে হীন অবস্থানে দেখা হত। শরীর বলের থেকে শিক্ষাজাত বোধবুদ্ধিকে ওপরে রাখা হত। শরীর প্রকৃতি প্রদত্ত, বিদ্যাচর্চা, জ্ঞান অর্জন মানুষের চেষ্টার ফসল। বহু কষ্টে, অনেক সুখ বিলাস আলস্য ত্যাগ করে জ্ঞান ও চেতনার সম্মিলনে মানুষের হুঁশ তৈরি হয়। স্বভাবতই অর্জিত জ্ঞান বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের সম্ভ্রম বোধ থাকে। আর এই শিক্ষালাভের জন্য যে বিদ্যায়তনগুলি আমরা গড়েছি, তার মধ্যে যাদবপুর অন্যতম। বহু মনীষার জ্ঞান চর্চায় এই বিশ্ববিদ্যালয় সমৃদ্ধ। এ এমনই এক বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষক-ছাত্র মিলে মুক্ত মনে যুক্তিবাদের চর্চা করে। এখানে প্রকৃত অর্থেই ঐতিহ্য ও আধুনিকতার প্রকৃত মেলবন্ধন ঘটে। যাদবপুরের কৃতবিদ্য ছাত্রছাত্রীরা সারা পৃথিবীজুড়ে তার সাফল্যের পতাকা উড্ডীন রেখেছে। অতি সাধারণ বাড়ির ছেলেমেয়েরাও যাদবপুরে পড়ার সুযোগ পেয়েও নিজ ক্ষেত্রে অর্থ ও সম্মান অর্জন করেছে। পরিবারের ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
অন্যদিকে, ছাত্ররা রাজনীতিতে চিরকাল আছে। ক্ষুদিরাম বসু বা প্রফুল্ল চাকী বা কনকলতা বড়ুয়াকে বয়সের অজুহাতে বিপ্লব থেকে তো আমরা দূরে রাখতে পারব না। এই অজুহাতে রবীন্দ্রনাথের সবুজের অভিযান, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা’ও নাকচ হয়ে যাবে। দিন-দিন নাবালক অপরাধীর সংখ্যা আমাদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিচ্ছে। প্রতিদিনের খবরের কাগজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের বিকৃত সব কীর্তিতে চমকে উঠছি আমরা। তার বদলে রাজনীতিতে আগ্রহী শিক্ষিত এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যদি বাড়ে, তাতে সমাজের মঙ্গল। দেশ ও দশের বিষয়ে খোঁজখবর রাখার ফলে আদর্শ নাগরিকের সংখ্যা বাড়ে। অন্যদিকে, যারা নিজেদের ছাত্র বলে অপরপক্ষকে বাম, অতিবাম, উদারপন্থী বলে আক্রমণ করল, তাদের সবাই তো অশিক্ষিত নয়। শিক্ষা, যা তারা স্কুল-কলেজে পেয়েছে, সেখানে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রত্যেকেই আছেন। তারা যদি ভালো করে খেয়াল করে, দেখবে, এঁরা প্রত্যেকেই উদার পন্থায় বিশ্বাস করেই মানবকল্যাণে ব্রতী হয়েছেন। সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে মেয়েদের ওপর সমাজের নিপীড়ন দেখে তাঁদের হৃদয় কেঁদেছে, তাই প্রবল বিরুদ্ধতা সহ্য করে আমাদের সমাজকে সহনীয় করে তুলেছেন তাঁরা।
এঁদের লেখা পড়ে এসেও এই ছাত্ররা এতদূর অসহিষ্ণু হয়ে উঠল কীভাবে? কোন সাহসে গেট ভেঙে, বাইরে আগুন জ্বালিয়ে, ভিতরে ঢুকল? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় হস্টেলের ভিতরে দেশবিরোধী হাওয়া চলছে, দেশ ভাঙার বিপজ্জনক পরিকল্পনা চলছে, সেটি দেখার কাজ আইনরক্ষকের ও আদালতের। তাদের কাজ এই বাইরের ছাত্ররা কোন অধিকারে নিজের হাতে তুলে নিল? এদের মদতদাতা নেত্রী বোঝালেন না কেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানে কতগুলো নির্দিষ্ট ইটকাঠ, চেয়ার, টেবিল, পুস্তক মাত্র নয়? সেখানে এক রকমের চেয়ার উঠিয়ে আরেক রকম চেয়ার বসালে বা এক ধরনের বইয়ের বদলে অন্য ধরনের বই ঢোকালেই দখল করা যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। শিক্ষিতের জন্য হাতের মার নয়, দরকার মগজ ধোলাই- আর তার জন্য দরকার শিক্ষা ও বিদ্যার চর্চা। ছাত্র নামধারী এই রাগি তরুণরা নিজেরা সেই চর্চা করছে তো?
ছাত্রদের থেকেও একই সঙ্গে যেটি কৌতুকাবহ ও ভয়ংকর সেটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভাষণ। তিনি ঠিক আগের সরকারের নেতা-নেত্রীদের মতোই কুকথার হুংকার ছাড়লেন। তবে যে আমরা শুনতাম, কড়া দক্ষিণপন্থায় ওপরতলার একটা নিমন্ত্রণ থাকে? অবাক হয়ে আমরা দেখে যাচ্ছি সকালে একজন নেত্রী যা বলেন, বিকেলে আরেক নেতা সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেন! দামাল নেত্রী আবার চাপে পড়ে পরের দিন সুর নরম করে নেন।
রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের যে একটি অনীহা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতি, সেটা তো তার কু-ব্যবহারের জন্যে। এই যে কিছুদিন আগে সিজেপি বা আইসার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন, তা একরকম রক্ত পরিশুদ্ধ করে দিয়েছে বলা যায়। দেশকে টুকরো করতে চায়নি তারা, কোন নৈরাজ্যের জন্ম দেয়নি। পার্শ্ববর্তী দুটি দেশের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনও তুলনাই চলে না। ছোটরা কোনও কাজ করলেই ভুল করবে এ ধারণা থেকে আমাদের মতো হতাশ ও সতর্ক বয়স্কদের বেরিয়ে আসতে হবে।
যাদবপুরে যে ভিন্নমতের প্রতি দখলদারি ও আক্রমণ, বিরোধী নিশ্চিহ্নকরণের জন্য দাঁতমুখ বের করে নিজেদের নগ্ন করা, এ আমরা আগের সরকারেও দেখেছি। অম্বিকেশ মহাপাত্রের সাধারণ একটি কার্টুন নিয়ে প্রায় তাঁর বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধ ঘোষণা অবিশ্বাস্য গল্পকেও হার মানিয়ে দিয়েছিল। দুঃখের বিষয় বহু মানুষের এই নবনির্বাচিত সরকারের কাছে অন্যরকম প্রত্যাশা ছিল। মনে রাখা দরকার শেষ অবধি সাধারণ মানুষ কোন একটি পন্থার কাছে যেতে চায়, তা বাম বা ডান যা কিছু হতে পারে, কিন্তু নৈরাজ্য বা বিভ্রান্তি নয়।
(লেখক সাহিত্যিক)

