সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে সাহিত্যিক বাণী বসু বলেছেন, ‘লেখক হওয়া যায় না, লেখক জন্মায়।’ কথাটি লেখক সম্পর্কে মানলেও, কালার ক্ষেত্রে মানতে নারাজ। যার কথা বলছি, সে কালো নয়। তবে ধবধবে ফর্সা না হলেও ওকে ফর্সাই বলা যায়। পৃথিবীর চরম সত্য এই যে, রঙে নয়, পয়সায় মানুষের নামকরণ হয়।
বেশ লম্বা, মাঝারি চেহারার কালা কোনও দিন স্কুলবাড়িমুখো হয়নি। জন্ম থেকেই পরিবারের মুখ চেয়ে পরের গোলামি করেছে। কালার তেমন কোনও সামাজিক মর্যাদা না থাকলেও, ‘গোপালপুর বারোয়ারি দুর্গাপুজো কমিটি’র মঞ্চের সম্রাট সে। সেই আটের দশকেই একের পর এক হিন্দি সিনেমার হিট গানের সঙ্গে নেচে আসল নায়কদেরই যেন পিছনে ফেলে দিত সে। দুটো চৌকি জোড়া দিয়ে, তার উপর বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো মা-কাকিমাদের শাড়ির শামিয়ানা। তার নীচে বালব ঝুলিয়ে তৈরি হত সাংস্কৃতিক মঞ্চ। কালা উঠলেই ভিড়টা যেন দাঁড়িয়ে যেত। পুজোর সময় প্রাণোচ্ছল, ছটফটে কালাকে দেখে কারও বলার ক্ষমতা ছিল না, ও এক নিঝুম অন্ধকারের বাসিন্দা। তখনও ‘স্টার’ শব্দটা গ্রামগঞ্জে থাবা বসাতে পারেনি। শুধু মনে হত, কালা আমাদের নায়ক। যাঁদের কথায় কালা উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে, তাঁদের চোখেও ওই এক রাতের মঞ্চে কালা নামের আলো দেখেছি।
আমাদের সংহতি শক্তির সংহতি। বলা ভালো, শক্তির সমন্বয়। তিল তিল করে সৌন্দর্য ও শক্তি আহরণ করেই দেবী দুর্গা হয়ে ওঠেন তিলোত্তমা। তাঁর আরাধনায় আমরা কেবল একজন দেবীকেই পুজো করি না, পুজো করি তাঁকেই, যাঁকে এক কথায় বলা যায় জীবন। নিজেদের সংসারের যে ধারণা, তার মধ্যেই প্রতিষ্ঠা করি দেবীকে। কবির ভাষায়, দেবতা প্রিয় হন, প্রিয় হন দেবতা।
সংহতি ও সংস্কৃতি শব্দ দুটি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি সমাজের অস্তিত্ব ও অগ্রগতির জন্য এই দুটি উপাদানই অপরিহার্য। সংহতির উৎসবে শামিল হয়ে ঘরে ফিরেই আবিষ্কার করি, নিঃসঙ্গতা এক রোগ। তাকে ঝেড়ে ফেলতে সঙ্গ দেয় প্রিয় মুখচ্ছবি, প্রিয়জনের স্মৃতি ও আবেগ। সুখ-দুঃখ এবং ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মনে হয়, আমি একা নই। আমার পাশের সমস্ত মানুষই যেন অমৃতের পুত্রকন্যা। সমবেত আমরা এমন এক আলোর প্রত্যাশী, যে আলো আনন্দের অভিলাষী।
পুজোয় ফিরি। চাম্পার জঙ্গলের মিলের চাতালে, যা পুজোর সময় হয়ে উঠত মাঠ, চলছে যাত্রানুষ্ঠান। ‘শ্রীদুর্গা শরণম রাইস মিল’-এর মালিক সান্যাল পরিবারের ‘বড়বাসা’ নামের বাড়িতে ছিল বাঁকুড়ার টেরাকোটার আদলে তৈরি দুর্গা মন্দির। বছরভর পূজিত দেবীর থানে পুজোর সময় শোভা পেত প্রতিমা। পুজোর চারদিন চলত ঢালাও খিচুড়ি আর পায়েসের প্রসাদ বিতরণ। রাতে যাত্রাপালা। দুইয়ের আকর্ষণে বহু দূরের গ্রাম থেকেও মানুষ পরিবারসমেত এসে পুজোর দিনগুলিতে অস্থায়ী সংসার পেতে বসতেন মিলের চাতালে।
কলকাতার চিৎপুর থেকে আসত যাত্রার দল। এসে জুটত তিন ফুট উচ্চতার বহুরূপী বলাই। সব যাত্রা দলের সঙ্গেই ভাব জমিয়ে হঠাৎ যাত্রার কোনও এক দৃশ্যে আবির্ভূত হয়ে বলত, ‘বাবুমশাই, আমি শুধুই হাসাই।’ দর্শকরা হেসে লুটোপুটি খেতেন। তেমনই এক যাত্রায় দেখেছিলাম, মাঠের দর্শকেরা যেন দুই দলে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ করছেন। সবার হাতেই অদৃশ্য তলোয়ার।
আলো নিভে আসা দশমীর বিদায়বেলায় দেবী ট্রাকে চড়ে চলেছেন বিসর্জনের ঘাটে। তাঁর পেছনে চলা মানুষগুলির মধ্যে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। শোক আর অপেক্ষার সেই নিস্তব্ধতা কাটিয়ে যমুনা নামের এক বৃদ্ধকে বলতে শুনলাম, ‘সান্যালবাবু না হয় খিচুড়ি না-ই বা খাওয়াতেন, মঞ্চ আর মাকে কী আর দু’একদিন রাখা যেত না?’
সান্যালবাবু অস্ফুটে বললেন, ‘বিদায়ের পরে মেয়েকে যে ঘরে রাখতে নেই রে যমুনা।’
দিনহাটা শহরের দক্ষিণে নয়ারহাট গোবরাছড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি গ্রাম পিকনিধারা। গ্রামটিকে চিনেছি আফতাবের সৌজন্যে। খুব কম কথা বলা ছেলেটি যে এত ভালো মঞ্চ সঞ্চালক, তা আমার জানা ছিল না। একবার ওর টানে পুজোয় গিয়ে জেনেছিলাম, পাড়ায় ওর নাম ‘হিরো’। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের গ্রামে একটিই দুর্গা মন্দির। গ্রাম্য জাঁকজমক কাকে বলে, সেই পুজোয় দেখেছিলাম।
আফতাবের মঞ্চ সঞ্চালনার ভাষাজ্ঞান দেখে বুঝেছিলাম, সঞ্চালনা কেবল একটি শিল্প নয়, একটি সাধনাও বটে। এই সাধনাই ওকে হিরো করেছে। চিনেছিলাম বর্ষার জলে পুষ্ট বানিয়াদহ নদীকে। সময়ের কালপ্রবাহে গতিপথ হারানো বানিয়াদহ আফতাবের ভাষায় যেন পুনরায় গতি পায়। তুতিয়ারকুঠি, ঐতিহাসিক গিতালদহ জংশন মাথা উঁচু করছে নিজস্ব গর্বে। আফতাবের সাহিত্যজ্ঞানও আমাকে মুগ্ধ করে। জেনেছিলাম, সারাবছর যেমন অপেক্ষা করতে হয় ওই একটি মঞ্চের আলোর জন্য, তেমনই একটু একটু করে সময় বের করে গুলে খেতে হয় সাহিত্য।
‘সারাবছর একটিই মঞ্চ! অন্য কোনও সাংস্কৃতিক মঞ্চে কেন যাও না? কেউ ডাকে না তোমায়?’
‘অনেক ডাক আসে। আমি যাই না।’
‘কেন যাও না?’
‘কারণ, অন্য মঞ্চে মায়ের চোখের প্রশ্রয় নেই।’
মুখে আলো পড়া, মাইকে নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে দর্শকের হাততালি, মহালয়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ থেকে বিজয়ার সিঁদুরখেলা, সবই যেন পুজোর সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে। বলতে গেলে, বাঙালির ষোলোকলার এক কলা এই মঞ্চ। যা নিছক বিনোদন নয়, জীবনেরও দিশা দেখায়।
একটি সাক্ষাৎকারে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন, শৈশব ও কৈশোরে পাড়ার দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে হওয়া বিভিন্ন নাটক ও থিয়েটারের মঞ্চে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন। পাড়ার ওই উন্মুক্ত মঞ্চের আলোই প্রথম তাঁর ভিতরের অভিনেতাকে সামনে এনেছিল এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার জন্ম দিয়েছিল।
কালিয়াগঞ্জের ঝুমা সাহার জীবনেও এমনই একটি মঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেখানে প্রথম গান গাওয়ার পর সাফল্যের উড়ানে তিনি পৌঁছে যান নামী এক টিভি চ্যানেলের চ্যাম্পিয়ন গায়ক খোঁজার প্রতিযোগিতায়। গঙ্গারামপুর ফটকপাড়ার অতুল রায়ের কণ্ঠে যে কুমার শানু বাস করেন, তাঁর পরিচয়ও প্রথম দিয়েছিল পাড়ার দুর্গাপুজোর মঞ্চ। বর্তমানে একটি টিভি সিরিয়ালের আবহসংগীতশিল্পী অতুল।
এমনই মঞ্চসফল শিল্পীদের তালিকা তৈরি করতে গেলে আসে বিতানের নাম। শিলিগুড়ির মহামায়াপাড়ার ভানু সে। কারণ, প্রতিবার মঞ্চে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিমিক্রি করে বিতান বলে ওঠে, ‘মাসিমা, মালপো খামু।’ তারপর দর্শক আর তাকে মঞ্চ থেকে নামতেই দিতে চান না।
কুইজ প্রতিযোগিতায় ভিন্ন মাত্রা আনতে পারে জগাইদা। ‘দুর্গা কোন স্কুলে পড়ত? কে বলতে পারবে?’ ছোটরা সবাই হাত তোলে। তারপর একে একে নিজেদের স্কুলের নাম বলে। জগাইদার কথায়, সকলের দুর্গা হতে চাওয়াই এই প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য।
কোনও অডিশন নেই, যোগ্যতার নির্দিষ্ট মাপকাঠিও নেই। সারা বছর হেঁশেল সামলানো মহিলাও অষ্টমীর রাতে ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী…’ গেয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। ‘আমি সেই মেয়ে…’ কবিতায় নিজের দীপ্ত পরিচয় তুলে ধরতে পারেন কোনও পরিচারিকাও।
বালুরঘাটের বিশ্বাসপাড়ার নেহা দিদিমণি মিউজিক্যাল চেয়ার প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু গত বছরের পুজোয় তিনি সাধনার কাছে হেরে গেলেন। খেলায় ছিল নগদ পুরস্কার। পরে একদিন দিদিমণি বলেছিলেন, ওই পুরস্কারের টাকায় সাধনা তার দুটো ছেলেমেয়েকে পুজোর জামা কিনে দিতে পেরেছিল।
মঞ্চের প্রতিযোগিতার অর্থ শুধু হারজিত নয়, সহমর্মিতাও। দুর্গাপুজোর সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এটাই। প্রতিমা তো কুমোরটুলিতে তৈরি হয়। কিন্তু পুজোর সংস্কৃতির একটি বড় অংশ তৈরি হয় মঞ্চে, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।’ কথাটির সামান্য অদলবদলেই যেন বদলে যায় অর্থ। এ পৃথিবী একবার পেলে তারে, হারাতে চায় না আর।
মতি নট্টকে সবাই মতিলাল বলে। হিন্দি শব্দ ‘মালামাল’ থেকে বাংলায় ‘লাল’। নামের সঙ্গে জুড়লে সচ্ছল বা টাকাওয়ালা বোঝায়। ওর দুটো ছেলেই প্রতিষ্ঠিত। বাবাকে বলেছে, আর যেন ঢাক না বাজায়। অন্য সময়ে কথাটা শুনলেও পুজোর সময় শোনে না মতি। রায়বাড়ির দুর্গাউঠোন মাতাতে হবে যে!
ঢাকের ধুলো সরিয়ে, আলগা হয়ে আসা চামড়া টেনে বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। মনের মধ্যে দেবীর ঘুম ভাঙানোর ও বোধনের গম্ভীর ছন্দের বোল উঠতেই কেঁপে উঠছে মতির শরীর। বিড়বিড় করছে, ‘অথর্ব শরীরে একটু আলো ফিরিয়ে দিস মা। যেন হারিয়ে না ফেলি তোকে।’
মানুষের ভালোবাসার মাপকাঠি আছে, মঞ্চকে ভালোবাসার মাপকাঠি নেই। আছে সমান্তরাল গতিপথ। আজকের বিশ্বায়নের যুগে থিম পুজোর চাকচিক্য বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু পাড়ার সাবেকি পুজোর আন্তরিকতা, অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, কুমারীপুজো, নবমীর ভোগ, এসবের পাশাপাশি মঞ্চও পুজোর আনন্দকে পূর্ণতা দেয়।
পাঁচ বছরের হিয়া এ বার জেদ ধরেছে। বলছে, পুজোয় আমার জামা চাই না, চাই শাড়ি। লাল পাড়ের শাড়ি। যা পরে দুর্গা হওয়া যায়। এ বার আমি মঞ্চে দুর্গা সাজব।
আসুন, একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। দেখুন তো, চিনতে পারেন কি না! হ্যাঁ, পেরেছেন দেখছি। সবজি বিক্রেতা কালা! যারা ওর নামকরণ করেছিল, তারা নিশ্চিত জানত, মাটি পুড়ে ইট হলে রংটা আর ফর্সা থাকে না। ক্রাচে ভর দিয়ে চলে সে। দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়েছে। হারিয়েছে নায়কসত্তা।
ওর পাশে একটি বাঁশি। জিজ্ঞেস করে দেখুন, ও বলবে, ‘মা আমার নাচের পা-টা কেড়ে নিয়েছে। মঞ্চ কাড়তে পারেনি। এই যে দেখছেন বাঁশি, সারাবছর সুর তুলি। তারপর সমস্ত অনুষ্ঠান শেষে পুজোর ফাঁকা মঞ্চে উগরে দিই জ্বালা। ভোরের আলো ফুটলে দেখি, একা আমি নই, জেগে আছে আর একজন। তিনি মা দুর্গা। সন্তানকে দুঃখ দিলে মায়ের চোখে কি ঘুম থাকে?’

