ঝেঁটিয়ে স্বাগত

শিক্ষা
Spread the love


ঝেঁটিয়ে স্বাগত

  • গৌতমেন্দু রায়

মরে গিয়ে পড়ে যায়?  নাকি পড়ে গিয়ে মরে যায় এই সত্যটা কখনও জানতে পারিনি। মৃতদেহটাকে পড়ে থাকতে দেখি ঘরের কোনায়, মেঝেতে। সেটি দেখে ভয় পান গৃহিণীরা। দুর্বলচিত্ত যাঁদের তাঁরা আর্তনাদ করে ওঠেন। ডেডবডিটিকে সরিয়ে ফেলার জন্য বাড়ির পুরুষসিংহটিকে সপ্তগ্রামে গলা চড়িয়ে ডাকেন। সেই মুহূর্তে ডেসিবেলের বেঁধে দেওয়া সীমার কথা মাথায় থাকে না। এসওএস-এর সিগন্যাল পেয়ে আড়মোড়া ভেঙে পুরুষসিংহটি হেলেদুলে আসেন।  তাঁর লয় ধীর। অর্থাৎ তিনি করমেতে বীর ও ধীর দুটোই। বীরের হাতে অস্ত্র। বীরাপ্পান যে অস্ত্র ব্যবহার করতেন এটা সেই কালাশনিকভ নয়। বরং এই অস্ত্রের নাম দেওয়া যেতে পারে খালাসনিকভ। সেই অস্ত্র  আর কিছু নয় একটি সম্মার্জনী অর্থাৎ ঝাড়ু।

                 এই ঝাড়ু বা ঝাঁটা অনেকটা বোরোলীনের মতো। বঙ্গজীবনের অঙ্গ, যুগপৎ প্রাচীন ঐতিহ্যও বটে।  মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা বাঙালির একটি আবেগ ও নস্টালজিয়া।  যেমন এই মোমেন্টে আমি খুবই নস্টালজিক, কেননা সব নষ্ট লজিকের ঊর্ধ্বে উঠে এই মুহূর্তে আমার সম্মার্জনী প্রসঙ্গে পরশুরামের কজ্জলী গল্পগ্রন্থের জাবালি গল্পটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। যে গল্পে আমরা দেখি অপ্সরা ঘৃতাচী ঝিকিমিকি টুম্পার মতো নেচে-কুঁদে বারবার ঋষি জাবালির তপস্যাকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জাবালি সেই অপ্সরাকে যা বলছেন তার মানেটা দাঁড়ায়- দেখুন ম্যাডাম আপনি এখানে এসে নাচ-টাচ দেখাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু আপনি মুখে যে লোধ্ররেণু অর্থাৎ পাউডার মেখে এসেছেন তা ভেদ করে আপনার রিংকেলস বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছে। এটাও বোঝা যাচ্ছে যে আপনি বয়স লুকোবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পাপ যেমন বাপকে ছাড়ে না তেমন বয়সও কিন্তু একেবারে ছেড়ে কথা বলে না। আপনার তো চোখের নীচে ডার্ক সার্কেল স্পষ্ট। দাঁতগুলোও ফাঁক হয়ে গেছে। দূর থেকেও তা স্পষ্ট দেখা যায়। রেগে আগুন ঘৃতাচী দমে যাওয়ার পাত্রী নন। উলটে তিনি জাবালিকে যা বলছেন তার সারাংশ হল- আসলেই আপনি একটি আকাট আনরোমান্টিক। তাছাড়া আপনার চোখে গ্লকোমার সমস্যাও আছে মনে হয়। সকালটা একবার হতে দিন তারপর আমিও দেখিয়ে দিচ্ছি কী করে আপনার মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিতে হয়।

ঠিক এইখান থেকে সম্মার্জনীর ভূমিকাটা খুব মাহাত্ম্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরের দিন সকালে দুধের সরে স্নান সেরে ঘৃতাচী তাঁর ব্যাটারি চার্জ করে নেন। জাবালিকে তাঁর মিশন থেকে ডিসট্রাক্ট করার জন্য ঘৃতাচী আবার ডান্স বাংলা ডান্স শুরু করতেই জাবালিপত্নী হিন্দ্রলিনী যা ঘটালেন সেটা বরং গল্পের আসল অংশটুকু থেকেই জেনে নেওয়া যাক। ‘অদূরবর্তী দেবদারুবৃক্ষের অন্তরালে থাকিয়া জাবালিপত্নী সমস্ত দেখিতেছিলেন। ঘৃতাচীর দ্বিতীয়বার নৃত্যারম্ভে তিনি আর আত্মসংবরণ করিতে পারিলেন না, সম্মার্জনী​হস্তে ছুটিয়া আসিয়া ঘৃতাচীর পৃষ্ঠে ঘা-কতক বসাইয়া দিলেন।’ তো, যা বলছিলাম। পুরাণ থেকে পলিটিক্স, লোকাচার থেকে অনাচার, শলার ঝাড়ু থেকে শুরু করে সোলার ঝাড়ু অর্থাৎ মহাজাগতিক ‘উইচস বুম নেবুলা’ -এই ঝাঁটা আমাদের সঙ্গী। ঝাঁটার সঙ্গে হাঁটা আমার ফুরাবে না, আমার ফুরাবে না। সেই ঝাঁটারই সঙ্গে সঙ্গে জগৎ চেনা।

                পড়ে গিয়ে মরে যাওয়া অথবা মরে গিয়ে পড়ে যাওয়া যে ডেডবডিটির কথা এই লেখার শুরুতেই বলেছি সেটি নিশ্চয়ই এতক্ষণে ডিসপোজ করে ভীরু গৃহিণীর বীরু কত্তাটি পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে দর্পের হাসি হাসছেন। বলাবাহুল্য তাঁর হাতে শোভা পাচ্ছে ‘পূর্ণ সম্মার্জনী’। যাকে অনায়াসে ‘ফুল-ঝাড়ু’ বলা যায়। মৃতদেহটি ততক্ষণে স্থানান্তরিত হয়েছে ডাস্টবিনে। সেই লাশটি টিকটিকিরও হতে পারে অথবা আরশোলার। জাবালি পত্নীর নাম হিন্দ্রলিনীই ছিল কি না তা কেউ জানে না।

পুরাণে অথবা অন্য কোনও শাস্ত্রে তার উল্লেখ আছে বলে আমি অন্তত শুনিনি। মনে হয় উনি পরশুরামের কল্পিত ক্যারেক্টার। কিন্তু  তাতে কিছুই আসে যায় না। হিন্দ্রলিনী না থাকলেও যুগে যুগে ঝাঁটা হাতে পত্নীরা তাঁদের স্বামীর ওপর সজাগ দৃষ্টি রেখে চলেছেন।  তা সেই স্বামী মুনি-ঋষি হোন বা আসামি।

                আমরা যেটাকে ডান্ডাঝাড়ু বলি ইংরেজিতে তাকেই কায়দা করে ব্রুমস্টিক নামে ডাকা হয়। সেই ব্রুমস্টিক ঝাঁটাপেটা করার কাজে লাগে না। তার ফাংশন আলাদা। তাতে চড়ে ইয়োরোপীয় ডাইনিরা আকাশে উড়ে বেড়ায়। তাদের এই বিহঙ্গবাসনার নেপথ্যে একটি বড় কারণ আছে। কারণটি খুবই সিম্পল। ইউরোপের স্বামীরা গাছতলায়, চাতালে, পাহাড়-পর্বতের গুহায় অথবা আশ্রমে বসে   ধ্যান করেন না। তাঁরা বিয়ার অথবা ওয়াইনের বোতল হাতে কখন কোথায় থাকেন তা ঠাহর করা খুবই কঠিন। সেজন্যই কিছু ডাইনি টাইপ গিন্নি ড্রোনের মতো ব্রুমস্টিক চেপে তাঁদের ওপর হয়তো নজরদারি চালান। যস্মিন দেশে যদাচার। তবে ঝাঁটা হাতে অথবা তাতে চেপে বসে পুরুষমানুষটির ওপর নজর রাখা রমণীদের ডাইনি বলা অনুচিত। তাতে আইনি সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তবে ব্যক্তি হিসেবে আমরা কাকে কী বললাম কী বিশেষণে আখ্যায়িত করলাম তাতে কিছুই যায় আসে না। দেখতে হবে ইতিহাসের পাতায় তাদের কী মূল্যায়ন করা হয়েছে। এমন একটা সময় ছিল যখন ঝাঁটায় চেপে ঘোরাঘুরি স্বাভাবিক বলেই ধরা হত। সে এক অতিপ্রাচীন যুগের কথা। তখনও খ্রিস্ট ধর্মের প্রসার হয়নি। সেই সময়ে ইউরোপের অনেক দেশে কৃষকদের মধ্যে একটি রীতি চালু ছিল। দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গেলে ঘোড়ার পিঠে উঠে ‘ঘোড়াঘুরি’ করাটা যেমন পর্যটকদের একটি আবশ্যিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, ঠিক তেমনই, সাদাচামড়ার ওই কৃষকরা দু’পায়ের ফাঁকে ঝাঁটাটি গলিয়ে ফসলের খেতে লাফালাফি করতেন।  তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল ঝাড়ুতে চেপে যে যত উঁচুতে লাফাতে পারবেন তাঁর ফলন সবচাইতে ভালো হবে। পরে, খ্রিস্ট ধর্ম প্রসারের পর, যাজকরা এই প্রথাটিকে শয়তানের আরাধনা অথবা ডাকিনিবিদ্যা বলে দাগিয়ে দিলেন। কিন্তু এতসব করেও ঝাঁটার গরিমা কিন্তু কমল না। লোককথায় আর রূপকথায় ঝাঁটা কিংবা সম্মার্জনী সসম্মানে তার জায়গাটি পাকা করে নিল।  আমার এক বন্ধু জুতোর ব্যবসা করে খুবই ধনী হয়েছে। পরশ্রীকাতরেরা আড়ালে বলে ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ জানা আছে। ও তো আসলে জুতিয়ে বড়লোক হয়েছে।’ ঝাঁটার গুণগ্রাহীদের ক্ষেত্রেও বলা যায় ‘ও তো ঝেঁটিয়ে বোদ্ধা হয়েছে’। শেষোক্ত এই শ্রেণিতে আমি পড়ি কি না জানি না তবে ভেতরে ভেতরে একটি স্বরচিত গান গাইতে খুবই ইচ্ছে করে। গানটি হল ‘আমায় একটু জায়গা দাও ঝাঁটা তোমার পিঠে চড়ে বসি!’

                 বাঙালির লোকসংস্কৃতিতে ঝাঁটা হেলাফেলা করার জিনিস নয় বরং তা লক্ষ্মীর প্রতীক। ঘরের আবর্জনা শুধু নয় ঝাঁটা নাকি তার সঙ্গে সঙ্গে অমঙ্গলও দূর করে। যাঁরা বাস্তুটাস্তু মেনে চলেন তাঁরা আবার একধাপ এগিয়ে বলেন ঝাঁট দিলে নেগেটিভিটিও দূর হয়।  ঝাঁটা নিয়ে খাটা অর্থাৎ খাটাখাটনি করা আমার ধম্মে সয় না। কিন্তু সনাতন ধর্মে সম্মার্জনী যথেষ্ট সম্মাননীয়। তাই ঝাঁটায় পা লাগলে কপালে হাত ঠেকিয়ে অনেকেই নমস্কার করেন। ঝাঁটা ছুড়ে ফেলতে নেই, ঝাঁটা শুইয়ে রাখতে নেই।  কেউ ঘর থেকে বেরোচ্ছেন তখন তাঁর যাত্রাপথ ঝাঁট দিতে নেই এমন অসংখ্য নিয়মকানুন ঝাঁটার সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে।  বীরভূমের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ছবি তুলতে গিয়ে দেখেছি রেশমগুটি চাষির বাড়িতে প্রবেশপথের পাশেই ঝাঁটাকে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে বেশ উচ্চকিত ঢঙে।  অতিথিকে ঝেঁটিয়ে স্বাগত জানাবার এই অভিনব রীতি দেখে আমি তো খুব অবাকই হয়েছিলাম!

পিতৃপক্ষের শেষের দিকে অর্থাৎ দেবীপক্ষের সূচনার আগে ঝাঁটা নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। হিন্দু বাঙালির সেই সাবেকি প্রথা ‘ঘরঝাড়া’ আলস্য ভেঙে জেগে ওঠে। আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়িতে ঠিক ততটা না হলেও গেরস্তের বসতবাটীতে ফুল সুইং-এ সুইপিং চলে। ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়ে  মা দুর্গা বাপের বাড়ি আসছেন বলে কথা।  অমঙ্গল ঝেঁটিয়ে ফেলে শুদ্ধ বাতাবরণ তৈরি করতে হবে যে। তাঁর আগমনপথ কলুষমুক্ত করতে এই মুহূর্তে শক্তপোক্ত শুদ্ধ ঝাঁটাই যে চাই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *