- মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়
উত্তরবঙ্গের আকাশে তখন মেঘ রোদ্দুরের খামখেয়ালি লুকোচুরি আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে পুজো কমিটির বাজেট সংকটের চেনা ফিশফাশ। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ির মণ্ডপগুলোর সামনে ভিড় জমেছে ঠিকই, তবে পাবলিকের নজর কিন্তু ঠাকুরের চেয়েও বেশি ওই চকচকে লাল সাটিনের ফিতেটার দিকে। ওই যে ফিতে, ওটা আসলে কেবল একটা কাপড়ের চওড়া টুকরো নয়, ওটা হল ক্ষমতার আসল মাপকাঠি। কার কপালে জুটবে ওই ফিতে কাটার অপার মহিমা? কার কাঁচির ছোঁয়ায় ধন্য হবে পাড়ার পুজো? এই নিয়ে ক্লাবের অন্দরমহলে রীতিমতো এক অলিখিত কুরুক্ষেত্র চলে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল, পুজো এখন আর সেই আমাদের ছোটবেলার মতো চিরাচরিত ষষ্ঠী থেকে শুরু হয় না। এখন তো মহালয়ার পর দিন থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে ধুমধাম করে ফিতে কাটা শুরু হয়ে যায়। মহালয়ার ভোরবেলায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শেষ হতে না হতেই পুজো কমিটির ছেলেরা কাঁচি আর ফিতে নিয়ে মণ্ডপের সামনে পজিশন নিয়ে নেয়। পিতৃপক্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই উদ্বোধনের(Pujo inauguration) এমন ধুম লেগে যায়, যেন একটু এদিক-ওদিক হলে পুজোটা অন্য কোনও পাড়ার লোক এসে চুরি করে নিয়ে চলে যাবে। ষষ্ঠী আসতে আসতে তো পুজো প্রায় অর্ধেক শেষই হয়ে যায়।
বড় পুজোগুলো যখন কলকাতা থেকে লাখ লাখ টাকা উড়িয়ে টলিউডের মেকআপ মাখা নামী তারকা এনে জাঁকজমক করতে ব্যস্ত, মাঝারি পুজো কমিটিগুলোর সম্বল তখন নিখাদ লোকাল ট্যালেন্ট। আলিপুরদুয়ারের এক ক্লাবের সম্পাদক কাঁচুমাচু মুখে সেদিন বললেন, ‘দিদি, বাজেট এবার ডুগডুগি! হিরো আনার রেট শোনার পর বুক ধড়ফড় করছে, তাই এবার ফিতে কাটবেন(Ribbon Slicing) আমাদের পাড়ার পঙ্কজবাবু।’ পঙ্কজবাবু, যিনি পাড়ার একমাত্র লাইব্রেরিটার দেখভাল করেন আর তাসের বোর্ডে যাঁর অজেয় রেকর্ড। পঙ্কজবাবু যখন ধুতি সামলে কাঁচিটা হাতে নিলেন, চারপাশ থেকে মোবাইল ক্যামেরা এমনভাবে দপাদপ ঝলসে উঠল, যেন মনে হল অস্কারের লাল গালিচা! ফিতেটা কাটা হতেই ক্লাবের এক ছোকরা চেঁচিয়ে উঠল, ‘গুরু, এবার লটারিটা তোমারই লাগবে দেখে নিও!’ পঙ্কজবাবুর সেই চওড়া হাসি আর বুক ফোলানো চাউনি দেখে কে বলবে যে তিনি কাল সকালেই আবার তাস শাফল করবেন!
আসলে এই ফিতে কাটার সংস্কৃতি হল তোষামোদ আর সম্মানের এক অদ্ভুত ককটেল। এ যেন তেল আর জলের মতো। কোথাও হয়তো দেখা যায়, স্থানীয় নেতা বা পঞ্চায়েত প্রধান, মন্ত্রী, তাঁদের গাড়ি ছুটছে। প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি তিনিও ছুটছেন এ মণ্ডপ থেকে সে মণ্ডপে, এমন একখানা ভাব নিয়ে আসছেন, যেন ফিতেটা কাটলেই এলাকার সব ভাঙাচোরা রাস্তা এক রাতে হাইওয়ে হয়ে যাবে! রোগী সুস্থ হয়ে যাবে বা সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সব পালটে যাবে রাতারাতি! তাঁর পেছনে থাকা অনুগামীরা গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেন, ‘দাদা তুমি এগিয়ে চলো, আমরা কাঁচি নিয়ে আছি!’ কোনও কোনও পুজোয় হয়তো পাড়ার সেই রিটায়ার্ড হেডমাস্টারমশাইকে ধরে আনা হয়, যিনি এককালে ক্লাবের খোদ সেক্রেটারির কান মুলে ত্রিকোণমিতির সূত্র শিখিয়েছিলেন। ছাত্রটি আজ সেক্রেটারি হয়ে স্যরের হাতে কাঁচি তুলে দিয়ে বিনীতভাবে বলেন, ‘স্যর, এবার ফিতেটা কেটে পাপমুক্ত করুন!’ স্যরও কাঁচি চালাতে চালাতে মনে মনে ভাবেন, ‘যাক, অন্তত একটা পরীক্ষায় ছেলেটা পাশ নম্বর পাওয়ার মতো কাজ করেছে!’
তবে দিন বদলেছে আর তার সঙ্গে বদলেছে হাই প্রোফাইল অতিথিদের তালিকা। আজকাল আর শুধু পাড়ার পাতি নেতা বা মাস্টারমশাইয়ে পুজো কমিটির মন ভরে না। এখনকার ফ্যাশন হল কোনও বড় কর্পোরেট কর্তা, প্রভাবশালী শিল্পপতি কিংবা বড় কোনও প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্বকে উড়িয়ে আনা। এঁদের ডাকার পেছনে ক্লাবের আসল ফায়দা হল ক্ষমতার বড় বড় অলিন্দে নিজেদের একটু যোগাযোগ তৈরি করা। এই সমস্ত ভিআইপি অতিথিরা যখন বিলাসবহুল গাড়ি থেকে নামেন, তখন তাঁদের বডিগার্ডদের ধাক্কায় পাড়ার আসল লোকজনই মণ্ডপ থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। ক্লাবের ছেলেরা তখন হাত জোড় করে তাঁদের পেছনে ঘোরে এই আশায় যে, যদি পুজোর পর কোনও বড় কাজের বরাত বা ক্লাবের জিম বানানোর জন্য বড় কোনও সরকারি অনুদান পাওয়া যায়। সেই বড়বাবুরা গম্ভীর মুখে ফিতে কেটে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দেন আর মনে মনে ভাবেন, এ বছরও পাড়ার পুজোটাকে ভালোভাবে ম্যানেজ করা গেল।
এই কাঁচি বিপ্লবের পেছনে পুজো উদ্যোক্তাদের এক চরম পলিটিকাল আর ফিন্যান্সিয়াল অঙ্ক থাকে। কাকে দিয়ে ফিতে কাটালে পাড়ার বিরোধী গ্রুপ ঠান্ডা থাকবে, কার চ্যালাদের থেকে কতগুলো স্পনসরের বড় ব্যানার পাওয়া যাবে, আর কার বাড়ির থেকে মণ্ডপের কানেকশন বিনা পয়সায় মিলবে, সবটাই একদম নিখুঁত স্ক্রিপ্ট। শিলিগুড়ির এক ঝানু পুজো উদ্যোক্তা চোখ টিপে হেসে বললেন, ‘কাকে দিয়ে ফিতে কাটাব, সেটা বাছা মানে শেয়ার বাজারে টাকা খাটানো! আমরা এবার পাড়ার সবচেয়ে বড় র্যাশন ডিলারকে ধরেছি। ফিতেও কাটা হল, আবার পুজোর চারদিন ক্লাবের খিচুড়ির চাল-ডালও স্পনসর হয়ে গেল!’
বাস্তব এটাই যে, এই উদ্বোধনী মুহূর্তটি একজন সাধারণ মানুষকে বা কোনও হাই প্রোফাইল অতিথিকে কয়েক ঘণ্টার জন্য সুপারম্যান বানিয়ে দেয়। লাল ফিতেটা দু’টুকরো হওয়ামাত্রই যেন পাড়ার লোকের মনে হয়, উফ! পুজোটা অবশেষে অফিশিয়ালি ভ্যালিড হল! আর যদি কোনও ঝাড়ুদার বা ফুল বিক্রেতাকে দিয়ে কোনও ক্লাব ফিতে কাটায়! একেই বলে কপাল! পরের দিন সে তার পেটের ভাতের জন্য আবার ঝাড়ু নিয়ে বা ফুল নিয়ে বের হবে। এটাও এক ধরনের প্রচার, পাবলিসিটি বস!
বর্তমানে এগুলো আনন্দ, আর এইটুকুই তো আমাদের চেনা পাড়ার পুজোস্টার হওয়ার আসল রহস্য!
উদ্বোধনের এই হট্টগোলের মাঝেই মণ্ডপের এক কোণে ফুটে ওঠে পাড়ার সেই চেনা ছবিগুলো। জেনারেটরের ভটভট আওয়াজের সঙ্গে মাইকে তখন বাজছে ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’। ক্লাবের ছোট ছোট বাচ্চারা নতুন জামা পরে এদিক-ওদিক ওড়াউড়ি করছে আর ঢাকের কাঠির প্রথম আওয়াজ শুনতেই মণ্ডপের দিকে দৌড় লাগাচ্ছে। ওদিকে পাড়ার কাকিমারা মণ্ডপের পাশে একজোট হয়ে তদারকি করছেন, কার ঠাকুর দেখা কখন শুরু হবে আর জিলিপি ভাজার দোকানে এখনই কতটা লাইন পড়ল। ফিতে কাটার জাঁকজমক মণ্ডপের গেটে যে নাটকই তৈরি করুক না কেন, ভিতরে কিন্তু সেই চেনা গন্ধ আর ঢাকের আওয়াজটাই পুজোর আসল মনটা ছুঁয়ে যায়। তবে আসল চমকটা অন্য জায়গায়, ফিতে তো কাটা হল, কিন্তু পুজো শেষে সেই লাল ফিতেটার জায়গা কোথায় হয় জানেন? ওটা সযত্নে চলে যায় ক্লাবের স্টোররুমে, আগামী বছরের নতুন কোনও ফিতে কাটার মুখে আবার নতুন ইস্ত্রি খেয়ে চমকে ওঠার অপেক্ষায়!
আসলে উত্তরবঙ্গের পুজোয়(North Bengal Pujo) এই ফিতে কাটার নাটকটাই এখন আসল ইউএসপি দাঁড়িয়েছে। ফেসবুকে না উঠলে পুজো যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কমিটির ছেলেরা লাইভ করে, রিল বানায়, আর কমেন্টে লেখে ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কেউ কেউ তো ফিতে কাটার ভিডিও স্লো মোশনে এডিট করে ব্যাকগ্রাউন্ডে ঢাকের বাজনা জুড়ে দেয়। এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও সন্ধেবেলা চলে ফিতে কাটা নিয়ে পোস্ট মর্টেম। কে কেমন করে কাঁচি ধরল, কে হাসল, কার পাঞ্জাবি বেশি চকচক করল, অমুক নেতাদাদার সঙ্গে কথা বললাম, আমার হাত ধরেছিলেন, এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা। আর এইভাবেই একটি সামান্য লাল ফিতে উত্তরবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় ক্ষমতা, সম্মান আর বিনোদনের এক অদ্ভুত জিওমেট্রিক বা ত্রিকোণমিতির সূত্রগুলো মেলাতে থাকে।

