(১৯৩৯-এর ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত রেশ আজও বহন করছি আমরা।)
অঞ্জন বসু
যুদ্ধ কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। যুদ্ধ শুরু হলে ধ্বংস, মৃত্যু, উদ্বাস্তু সমস্যা আর অনিশ্চয়তা অনিবার্য। ইতিহাসের পাতায় তার অসংখ্য প্রমাণ ছড়িয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পরও পৃথিবী শান্তি পায়নি। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধ শেষ হলেও ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি জার্মানির উপর কঠিন শর্ত চাপিয়ে দেয়। অর্থনৈতিক দুর্দশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতীয় অপমানের আবহে নাৎসিবাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি দল জার্মানির ক্ষমতায় আসে। এরপর একের পর এক আগ্রাসন ইউরোপকে নতুন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তোষণনীতির সবচেয়ে স্মরণীয় দৃষ্টান্ত ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তি, যার মাধ্যমে চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড জার্মানির হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু হিটলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সেখানেই থামেনি। দুটি বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিলেন বেসামরিক মানুষ।
পোল্যান্ড ছিল পরবর্তী লক্ষ্য। ডানজিগ এবং পোলিশ করিডর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে হিটলার চাপ বাড়াতে থাকেন। ১৯৩৯ সালের ২৩ অগাস্ট জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেই চুক্তির গোপন প্রোটোকলে পূর্ব ইউরোপকে প্রভাববলয়ে ভাগ করার পরিকল্পনাও ছিল। ফলে ১ সেপ্টেম্বর ভোরে জার্মান বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ইউরোপের উপর নেমে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার। ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৭ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব দিক থেকে পোল্যান্ডে প্রবেশ করে। ২৮ সেপ্টেম্বর ওয়ারশর পতন ঘটে। জার্মানির দ্রুত ও সমন্বিত সামরিক আক্রমণ, যা ‘ব্লিট্সক্রিগ’ বা ঝটিকা যুদ্ধ নামে পরিচিত, পোলিশ প্রতিরোধকে বিপর্যস্ত করে দেয়। কিন্তু সেই যুদ্ধ আর শুধু পোল্যান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী ছয় বছরে ইউরোপ, এশিয়া এবং পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে তার আগুন। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবী বুঝেছিল, শক্তির দম্ভের শেষ পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে।
এই কারণেই ১ সেপ্টেম্বর শুধু একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়, যুদ্ধের বিরুদ্ধে মানুষের অঙ্গীকারেরও একটি দিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকে স্মরণ করে বিশ্ব ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ১ সেপ্টেম্বরকে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন ডে অফ ট্রেড ইউনিয়ন্স ফর পিস’ হিসেবে পালন করে। শ্রমজীবী মানুষ এবং শান্তিকামী সংগঠনগুলি এই দিনে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তি ও মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানায়। যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থব্যয়ের বদলে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, কাজ এবং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য ব্যবহৃত হোক, এই দাবিও উঠে আসে। কারণ একটি যুদ্ধের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার ক্ষত থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। একটি শিশুর শৈশব, একটি পরিবারের ঘর, একটি মায়ের সন্তান, একটি মানুষের স্বপ্ন, যুদ্ধ এক মুহূর্তেই কেড়ে নিতে পারে।
আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে সংঘাত ও যুদ্ধের খবর যখন প্রতিদিন আমাদের সামনে আসে, তখন ১ সেপ্টেম্বরের তাৎপর্য আরও গভীর। গাজায় ইজরায়েলি সামরিক হামলা এখনও চলছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইরানের নতুন করে সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং তেলের দামে চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের ভাষা যতই শক্তিশালী হোক, তার সবচেয়ে বড় মূল্য চোকায় সাধারণ মানুষই। যে মানুষটি সকালে কাজে যায়, যে মা সন্তানের জন্য রান্না করেন, যে ছাত্র বই নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়, যে শ্রমিক দিনের শেষে সামান্য মজুরি নিয়ে বাড়ি ফেরে, যুদ্ধ প্রথম আঘাতটি করে তাদের জীবনেই। তাই শান্তি কোনও দুর্বলতার কথা নয়। শান্তি মানে মানুষের জীবন, পরিশ্রম, শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার ছয় বছর পৃথিবীকে যে শিক্ষা দিয়েছিল, তা যেন বিস্মৃত না হয়। লাল পতাকা হাতে মিছিল হোক কিংবা নীরব প্রার্থনা, সভা হোক কিংবা শ্রেণিকক্ষের আলোচনা, সব জায়গা থেকেই উচ্চারিত হোক মানুষের বাঁচার অধিকার।
(লেখক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিক। সোনারপুরের বাসিন্দা।)

