(দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে আসা চৌকশ আধিকারিকরা যখন অর্ধশিক্ষিত নেতাদের দম্ভের কাছে মাথা নোয়াতে অস্বীকার করে ইস্তফাপত্র ধরিয়ে দেন, তখন বুঝতে হবে ঘুণ ধরেছে খোদ গণতন্ত্রের কাঠামোতেই।)
জয়জিৎ বণিক
লন্ডনের জাঁকজমকপূর্ণ কর্পোরেট দুনিয়া, মোটা মাইনের চাকরি আর নিশ্চিন্ত জীবন—এসব ছেড়ে দেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন এক তরুণী। উদ্দেশ্য ছিল, দেশের মাটির ঋণ শোধ করা। তিনি দিব্যা মিত্তল। আইআইটি দিল্লি এবং আইআইএম ব্যাঙ্গালোরের মতো দেশের সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে লন্ডনের জেপি মর্গান সংস্থায় কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ তাঁকে ফিরিয়ে আনে। সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ৬৮ নম্বর র্যাংক নিয়ে তিনি আইএএস আধিকারিক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু ১৩ বছরের উজ্জ্বল প্রশাসনিক কেরিয়ারের পর, গত রবিবার তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে গোটা প্রশাসনকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন।
কেন এই চরম সিদ্ধান্ত? উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের লহুরিয়াদহ গ্রামের দিকে। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেলেও এই গ্রামের মানুষ কলের জল চোখে দেখেননি। সরকারি নথিতে লেখা থাকত, দুর্গম এলাকায় জলের পাইপ বসানো অসম্ভব। পানীয় জলের জন্য মানুষকে মাইলের পর মাইল পথ হাঁটতে হত, জলের অভাবে এই গ্রামে কেউ মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত দিতে চাইতেন না। মির্জাপুরের জেলা শাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দিব্যা এই ‘অসম্ভব’ শব্দটিকে মানতে অস্বীকার করেন। প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে নিয়ে টানা নয় মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে গ্রামের ১২৫টি বাড়িতে প্রথমবার পাইপের মাধ্যমে পানীয় জল পৌঁছায়। এক বৃদ্ধা আদিবাসী নারী কেঁদে ফেলে দিব্যার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন, যে ছবি সমাজমাধ্যমে প্রবল আলোড়ন ফেলেছিল।
কিন্তু এখানেই রাজনীতির কদর্য রূপটি প্রকট হয়। জল আসার পর গ্রামে যে ছোট অনুষ্ঠানটি হয়েছিল, সেখানে আমন্ত্রণ পাননি স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদরা। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল এবং রাজ্যের মন্ত্রী আশিস প্যাটেলের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা নিজেদের ব্রাত্য মনে করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁদের অহংকারে আঘাত লাগার ফলস্বরূপ, ইতিহাস গড়া ওই প্রকল্পের পরেই দিব্যাকে সেখান থেকে বদলি করে ওয়েটিং লিস্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আরও মর্মান্তিক বিষয় হল, ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গ্রামের সেই জলের পাইপলাইন ভেঙে দেওয়া হয়, বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীদের আবারও ট্যাংকারের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়।
দেওরিয়া জেলাতেও তিনি জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বিনা রক্তপাতে শত শত একর সরকারি জমি উদ্ধার করেছিলেন। গ্রামীণ শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ভাষা শিক্ষার আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মীদের জেলের হুমকি দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, কোনও সাংসদ বা বিধায়ক আধিকারিকদের বদলির জন্য বেআইনি চাপ দিতে পারবেন না। এর পরিণতি হিসেবে তাঁকে লখনউতে বদলি করে রাজস্ব দপ্তরের এক আপাত গুরুত্বহীন পদে বসানো হয়। চার মাস এই দমবন্ধ করা পরিবেশে কাটানোর পর সমাজমাধ্যমে বার্তার মাধ্যমে তিনি তাঁর ইস্তফার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তাঁর ৪২৮ শব্দের ইস্তফাপত্রে লেখা ছিল, পদ চলে যেতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন নয়। মজার ব্যাপার হল, দিব্যার স্বামী গগনদীপ সিং ধিলোঁ—যিনি নিজেও আইআইটি এবং আইআইএম-এর প্রাক্তনী এবং বাণিজ্যমন্ত্রকের যুগ্ম ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন—একইভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ২০২২ সালের মে মাসে সরকারি চাকরি ছেড়ে গ্লোবাল ফিন্যান্সের দুনিয়ায় ফিরে গিয়েছেন।
হিন্দি বলয় থেকে শুরু করে গোটা দেশেই আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। মেধা ও যোগ্যতার শীর্ষে থাকা এই ধরনের আধিকারিকদের দিনের পর দিন এমন সব রাজনৈতিক নেতাদের কাছে মাথা নত করতে হয়, ‘জি হুজুর!’ করতে হয়, যাঁদের অনেকেই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। নিজেদের রাজনৈতিক জমি শক্ত করতে এবং দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করতে এই নেতারা পদে পদে যোগ্য আমলাদের অপমান করেন।
তবে এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনচেতা আমলাদের কণ্ঠরোধ করার প্রবণতা শুধু একটি নির্দিষ্ট দলের বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দলমতনির্বিশেষে এই ব্যাধি সারা দেশেই ছড়িয়েছে। ২০১৯ সালের অগাস্ট মাসে কন্নন গোপীনাথন নামের এক আধিকারিক ইস্তফা দেন। কেরলের বন্যার সময় নিজের পরিচয় গোপন রেখে ত্রাণের বস্তা কাঁধে বয়ে যিনি গোটা দেশের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, সেই কন্নন বাকস্বাধীনতার অভাবের প্রতিবাদে চাকরি ছাড়েন। ঠিক এক মাস পর, কর্ণাটকের আধিকারিক শশীকান্ত সেন্থিল ইস্তফা দিয়ে জানান, গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি যখন আপস করা হচ্ছে, তখন সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা অনৈতিক। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পর রাজ্য প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে ২২ বছরের চাকরি ছেড়েছিলেন হর্ষ মান্দার। কেরলের রাজু নারায়ণস্বামী জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে বামপন্থী এবং কংগ্রেস—দুই আমলেই কুড়িবারের বেশি বদলির শিকার হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনকাল থেকে শুরু করে তৃণমূল আমল পর্যন্ত এই ধারাই অব্যাহত। বাম আমলে যুগান্তকারী ভূমি সংস্কারের রূপকার দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, কৃষকদের ক্ষমতায়নের বদলে এই ব্যবস্থাকে মাঝারি স্তরের দলীয় নেতারা নিজেদের আধিপত্য কায়েমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। বিক্রম সরকারের মতো প্রবীণ আধিকারিকও স্থানীয় দলীয় কমিটির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছিলেন। পুলিশকর্তা ডঃ নজরুল ইসলাম বাম আমলে নেতাদের ঘনিষ্ঠ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর তৃণমূল আমলে তাঁকে ক্ষমতাহীন পদে বসিয়ে রাখা হয় এবং সরকারের বিরুদ্ধে বই লেখার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।
শাসকদল আধিকারিকদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করার চেয়ে তাঁদের গুরুত্বহীন পদে বা শাস্তিমূলক বদলিতে ফেলে রাখতেই বেশি পছন্দ করে। কারণ একজন সৎ আধিকারিককে বরখাস্ত করলে বা ইস্তফা দিতে বাধ্য করলে তিনি রাতারাতি জনমানসে নায়ক হয়ে যান, যা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর। তাই তাঁদের ক্ষমতাহীন করে ফেলে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল। এর দুটি ধ্রুপদি উদাহরণ হলেন পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রাক্তন পুলিশকর্তা কে জয়রামন এবং দময়ন্তী সেন।
২০১৩ সালে শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রায় ২০০ কোটি টাকার দুর্নীতি ফাঁস করতে গিয়ে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার কে জয়রামন পর্ষদের প্রাক্তন প্রধান তথা এক উচ্চপদস্থ আমলাকে গ্রেপ্তার করেন। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্য সচিবালয় নির্দেশিকা জারি করে জানায়, জয়রামন নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন। তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সাসপেন্ড করে বাধ্যতামূলক অপেক্ষায় পাঠানো হয় এবং বছরের পর বছর ধরে তাঁকে কেবল প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ের মতো নিষ্ক্রিয় পদে ফেলে রাখা হয়।
একই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল দময়ন্তী সেনকে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ কাণ্ডের পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাটিকে বিরোধীদের চক্রান্ত এবং ‘সাজানো ঘটনা’ বলে প্রকাশ্যে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। জননেত্রীর ভাবমূর্তি বড় করে তুলতে গিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অনেক সময়ই জনসমক্ষে আধিকারিকদের নাম ধরে কটাক্ষ করতে বা চরম অপমান করতে পিছপা হননি। কিন্তু কলকাতা পুলিশের প্রথম মহিলা যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) দময়ন্তী সেন রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা না নুইয়ে সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন ঘেঁটে প্রমাণ করে দেন যে ধর্ষণ সত্যিই হয়েছিল। মূল অভিযুক্তরা ধরা পড়ে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর কথার অবাধ্য হওয়ার মাশুল হিসেবে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা থেকে সরিয়ে ব্যারাকপুর পুলিশ ট্রেনিং কলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। ভারত সরকার যখন বিশ্বমঞ্চ থেকে উচ্চশিক্ষিত মেধা দেশে ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সেই প্রতিভাদের গলা টিপে মারছে। এর ফলে প্রশাসন ক্রমশ এমন সব মেরুদণ্ডহীন, তোষামোদকারী আধিকারিকদের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে, যাঁরা জনগণের সমস্যার সমাধান করার বদলে রাজনৈতিক প্রভুদের সন্তুষ্ট রাখতেই বেশি ব্যস্ত। আমলাতন্ত্রের যে নিরপেক্ষতা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করার কথা, তা আজ দলদাসে পরিণত হয়েছে।
যে আধিকারিকরা গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য জল আনতে পাহাড় ভাঙতে পারেন, অথবা গ্রামীণ শিশুদের জন্য নিজের উদ্যোগে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে পারেন, তাঁদের হারিয়ে আসলে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকদের কাছ থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে। আমাদের আজ নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি এমন এক ব্যবস্থা চাই যেখানে সরকারি কর্মীরা শুধু নথিপত্রের স্তূপে মুখ গুঁজে থাকবেন? নাকি এমন কাউকে চাই যিনি পঁচাত্তর বছরের জলকষ্টের কথা শুনে বলবেন, ‘ঠিক আছে, দেখি কীভাবে করা যায়’? দিব্যা মিত্তলদের মতো আধিকারিকদের সরে যাওয়া আসলে কোনও ব্যক্তির হার নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক চেতনার চরম পরাজয়।
(লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক)

