ভিন্নমত বনাম সহিষ্ণুতা

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


সহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি নিঃসন্দেহে। তা সত্ত্বেও শব্দটি নিয়ে চর্চা হচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা থাকে না, সহিষ্ণুতায় আঘাত লাগছে বলে এত আলোচনায় আসছে। শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, অধিকারের প্রশ্নে কেউ সোচ্চার হলেও বিপরীত পক্ষে অসহিষ্ণুতার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি জেন জেড-এর আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও বিষয়টি সামনে আসছে। ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া সহিষ্ণুতাকে সাংবিধানিক মূল্যবোধ বলে চিহ্নিত করেছেন।

পরিপ্রেক্ষিতটা এমনই হয়ে উঠেছে যে, বিচারপতিকে বলতে হয়েছে, সংবিধান ভিন্নভাবে কথা বলা, ভিন্ন চিন্তা ও ভিন্ন বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করে। বিচারপতি ভুঁইয়ার মতে, মতপার্থক্য বা ভিন্নমতকে যখন দমন, প্রত্যাখ্যান বা শাস্তি দেওয়া হয়, তখন অসহিষ্ণুতা সাংবিধানিক কাঠামোকে দুর্বল করতে শুরু করে। প্রায় একই সময়ে সহিষ্ণুতার জয়গান গেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত। অথচ তাঁর সংগঠনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অসহিষ্ণুতা প্রকাশের অভিযোগ ওঠে।

নিউ ইয়র্কের মাটিতে দাঁড়িয়ে সংঘ প্রধান সওয়াল করেছেন দেশের অন্যতম বড় স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, কোনও হিন্দু যদি দাবি করেন যে ভারতে কোনও মুসলিম থাকবে না, তাহলে তিনি হিন্দুত্বের অর্থ বুঝতে ব্যর্থ। ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজ বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। এমন ঘোষণার বিপরীতে ভিন্নমত প্রকাশকে দেশবিরোধিতার শামিল বলে দমনপীড়নের চেষ্টা সমানভাবে দেখা যাচ্ছে। যা সহিষ্ণুতার কফিনে পেরেক বিদ্ধ করে।

বাংলার কথা ধরলে সম্প্রতি খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একের পর এক মন্তব্য যেন সেই একেকটি পেরেক। যাদবপুরের প্রসঙ্গে তাঁর সদ্য আস্ফালন নজর কেড়েছে- হয় ওঁরা থাকবেন, না হয় আমরা থাকব। যা কার্যত ভিন্নমতের বিরুদ্ধে শেষযুদ্ধের ঘোষণার মতো। তেমনই তৃণমূলকে আর ঘুরে দাঁড়াতে দেব না, সিপিএমকে উঠে দাঁড়াতে দেব না গোছের মন্তব্য বাস্তবে বিরোধীশূন্য শাসন ব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য। যা ভারতে সংবিধান স্বীকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল ধারণাটির বিপরীত।

সহিষ্ণুতার যে অর্থ বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভাগবত বুঝিয়েছেন, তা কিন্তু এমন মন্তব্য বা পদক্ষেপের সঙ্গে মেলে না। কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত এক মহল্লায় পানীয় জলের জোগান বন্ধ করে রাখা শুধু অসহিষ্ণুতা নয়, অমানবিকও বটে। অথচ সংঘ প্রধান ভারতে এমন এক সমাজ আছে বলেছেন, যেখানে বসবাসকারী সবাই সবাইকে নিয়ে চলেন।

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে উপলব্ধি করাই ভারতের দায়বদ্ধতাকে সহিষ্ণুতার মর্মবস্তু বলে সরসংঘচালকের মন্তব্য নিঃসন্দেহে সহিষ্ণুতার বড় দিশা। কিন্তু ভিন্নমতের প্রতি কী রাজ্যে, কী কেন্দ্রে শাসক শিবিরের যে ঘৃণা ও তা প্রকাশ হতে দিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েেছ ঘোর বাস্তব। অথচ ধ্রুবসত্য হল বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার মত- বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা যেখানে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাসের সূচনা হয়। পড়ুয়ারা প্রয়োজনে কঠিন প্রশ্ন করার পরিসর পায়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তেমনই একটি জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান। সেখানে শাসক শিবিরের ভিন্নমতের চাষ হতেই পারে, তার সপক্ষে পড়ুয়ারা সংগঠিত হতেই পারেন। পড়ুয়ারা শাসককে প্রশ্ন করতেই পারেন। তাই বলে তাঁদের দেশদ্রোহী, টুকরে টুকরে গ্যাং, আরবান নকশাল বলে তকমা দেওয়ার মধ্যে সহিষ্ণুতার বালাই থাকে না। বহুত্ববাদী গণতন্ত্র অনেকটা রামকৃষ্ণ দেবের ‘যত মত, তত পথ’-এর মতো। অর্থাৎ হিন্দু ধর্মেও ভিন্নমতের স্বীকৃতি আছে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির উপস্থিতির বিরুদ্ধে পড়ুয়াদের প্রতিবাদে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল’ স্কুল ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন বাতিল হয়ে গেলেও বিচারপতি সূর্য কান্ত কিন্তু সহিষ্ণুতার বার্তা দিয়েছেন। পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপের বিরোধী মত ছিল তাঁর। দেশ ও রাজ্যের শাসক শিবিরের মনোভাব কিন্তু ভাগবত ও বিচারপতিদের মতের পরিপন্থী। এতে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়- কাকে বিশ্বাস করব?



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *