জাঁকিয়ে প্রোমোটারি, চেয়ারম্যান বদলে কী লাভ

জাঁকিয়ে প্রোমোটারি, চেয়ারম্যান বদলে কী লাভ

ব্লগ/BLOG
Spread the love


গৌতম সরকার

মাত্র ১২.৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন। ছোট্ট সেই ময়নাগুড়ি শহরটার নিয়ন্ত্রণ যেন প্রোমোটার, ঠিকাদারদের হাতে। নিকাশিনালার ঠিক নেই, সব বাড়িতে জল জোগানোর ব্যবস্থা নেই। কিন্তু শহরের যেখানে যেটুকু জমি আছে, তাতে জাঁকিয়ে চলছে প্রোমোটাররাজ। পুরোনো বাড়ি ভেঙে আবাসন তৈরির জন্য চাপ আসছে মালিকদের ওপর। বয়সে নবীন পুরসভা সেই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া দূরে থাক, কোথাও কোথাও দোসরের ভূমিকায়।

ময়নাগুড়ি উদাহরণ মাত্র। ছোট-বড় প্রায় সব শহরে প্রোমোটার-ঠিকাদাররা যেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। কোনও শাসন তাঁদের জন্য নেই। শিলিগুড়িতে ভক্তিনগর থানার পূর্ব রবীন্দ্রনগরে ৬৪৪ নম্বর খতিয়ানের ২১৮/৬৭০ দাগে একখণ্ড জমিতে মালিকের বিনা অনুমতিতে বেআইনি নির্মাণ হয়ে গেল। আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পুরসভা নির্মাণটি বেআইনি বলেছিল। থানায় নালিশ জমা পড়েছিল। বেআইনি নির্মাণ বন্ধ হয়নি। প্রোমোটারের কাছে যে আইন-আদালত তুচ্ছ।

সব শহরেই মানুষের অসন্তোষ পাহাড়প্রমাণ। নাগরিক সমস্যায় যত না নজর, তার চেয়ে পুরসভাগুলি বেশি ব্যস্ত কার হাতে ক্ষমতা থাকবে, কে হবেন চেয়ারম্যান ইত্যাদি নিয়ে। পিরিতি যেমন কাঁঠালের আঁঠা। লাগলে পরে ছাড়ে না। ক্ষমতাও তাই। অনেকটা চিটে গুড়ের মতোও বটে। চটচট করে, কিন্তু মিষ্টির আকর্ষণ এত যে, মুখে দেওয়ার লোভ সামলানো যায় না। দল না চাইলেও তৃণমূলের অনেক চেয়ারম্যান পুরসভার সিটে এই কারণে সেঁটে বসে আছেন।

ভোট দিয়ে মানুষ পালটে দেওয়ার আগে তৃণমূল নেতৃত্ব নিজেরাই সম্প্রতি অনেক পুরসভায় চেয়ারম্যান বদলে দিয়েছে। কেউ কেউ বিনা বাক্যব্যয়ে সেই হুকুম তামিল করেছেন। কেউ গজগজ করলেও ইস্তফাপত্রটি জমা দিয়েছেন। সামান্য দু’-একজন চেয়ার আঁকড়ে আছেন। তাঁদের কপালে দলের গলাধাক্কা অপেক্ষা করছে কি না, সময় বলবে। প্রশ্নটা ভিন্ন। এই দলবদল কেন? তাতে লাভ কী? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, কেউ পদে থাকবেন কি থাকবেন না, তা ঠিক হবে তাঁর পারফরমেন্সের ভিত্তিতে।

কীসের পারফরমেন্স? নেতা বা জনপ্রতিনিধির এলাকায় দল ভোটে জিতেছে কি না। আর কিছু জানার দরকার নেই। মানুষটি কেমন? জনপ্রিয়তা আছে কি না, সৎ কি না, সাংগঠনিক বিষয়ে জ্ঞান কতটা ইত্যাদি জানার প্রয়োজন নেই। শুধু জানলে হবে যে, ভোট দাও, পদ নাও। ব্লক সভাপতি হও, জেলা সভাপতি হও, চেয়ারম্যান হও, সাংসদ বা বিধায়কের টিকিট নাও কিংবা কোনও সরকারি সংস্থার চেয়ারম্যান হও। কিন্তু দলকে জেতাতে হবে।

কোনও দলের সিদ্ধান্ত আমি-আপনি বলার কে? ঠিকই তো, কিন্তু বলতে না পারলেও তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের বুকে প্রশ্ন- সিদ্ধান্ত কেন সকলের জন্য সমান হয় না? আলিপুরদুয়ারে তৃণমূল গোহারা হারলেও চেয়ারম্যান কেন বদল হয় না? শিলিগুড়ি সহ দার্জিলিং জেলার সব বিধানসভা আসন নাগালের বাইরে থাকলেও মেয়র পদে কেন নতুন কাউকে বসানো হয় না?

এসব কথা নাহয় ছেড়ে দিলাম। যাঁর পাঁঠা, তিনি ল্যাজে কাটবেন না মুড়োয় কাটবেন, তাঁর ব্যাপার। মানে তৃণমূলের ব্যাপার। প্রশ্নটা হল, এই বহুচর্চিত রদবদলের কোনও প্রভাব ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে পড়বে কি? আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্র পদ্মমুক্ত হবে তো? বিজেপির মুঠো থেকে শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্র বের করা যাবে তো? জলপাইগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্র ধরে রাখা যাবে কি?

চেয়ারম্যান বদলে জনতার অসন্তোষের পাহাড় ডিঙোনোর দায়িত্ব যাঁদের দেওয়া হল, তাঁদের কেউ খুনের আসামি, কারও বিরাট ঠিকাদারি ব্যবসা, কারও টাকা খাটে প্রোমোটারিতে, কেউবা যুক্ত বালির কারবারে। কারও বিরুদ্ধে আবার পক্ষপাত, দলবাজি, বিরোধীদের দমনপীড়ন ইত্যাদি অভিযোগ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কিংবা স্বাস্থ্যসাথীর কি সেই বিরূপ মনোভাবকে পুরোপুরি ঢেকে দেওয়ার শক্তি আছে?

এমন নয় যে, শক্তিশালী বিরোধীপক্ষের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বরং ভোটের পরিসংখ্যানে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি মানুষের সমস্যা নিয়ে নীরব। ধরলা, জরদা নদী দখল হয়ে যাওয়ায় ময়নাগুড়ি শহরের নিকাশি ব্যবস্থা চৌপট হয়ে গেলেও তা নিয়ে কোনওদিন মিছিল করেনি বিজেপি। খড়িবাড়িতে জন্মের ভুয়ো শংসাপত্র বিলির বিরাট চক্রের হদিস মিললেও বিজেপির ধারাবাহিক কোনও আন্দোলন নেই।

একদিন শিলিগুড়ির বিধায়ক শংকর ঘোষ গেলেন, ভিডিও-তে বিবৃতি দিলেন। ব্যাস, আন্দোলন শেষ। রাজগঞ্জের বিডিও’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, এমনকি খুনের অভিযোগ উঠলেও তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবিতে উত্তরবঙ্গজুড়ে আন্দোলনের কথা ভাবলই না বিজেপি নেতৃত্ব। নদিয়ায় বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদারের গাড়িতে হামলা হল। কোচবিহারে শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় আক্রান্ত হল। শুধু ডেপুটেশন আর বিবৃতিতে প্রতিবাদ শেষ হল।

ইংরেজবাজার ও আলিপুরদুয়ার পুর এলাকায় যে দিনের পর দিন জলাজমি, নয়ানজুলি ভরাট করে শহরের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে, সর্বোপরি এলাকার বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বিজেপির প্রতিবাদ নেই। সিপিএম বা কংগ্রেসের কণ্ঠস্বর এতই ক্ষীণ বা সমর্থন এত দুর্বল যে জনমনে ভরসা তৈরি করতে পারছে না।

মানুষের সমস্যার সঙ্গে বিরোধী শিবির যুক্ত না থাকলেও, আন্দোলন সংগঠিত না করলেও তৃণমূলের কাছে চ্যালেঞ্জটা আগামী ভোটে কঠিন কেন? কারণ জনবিচ্ছিন্নতা। কারণ দলের নেতাদের একাংশের ঔদ্ধত্য, দুর্নীতি, পক্ষপাত। বাম জমানার শেষদিকে যে রোগে ধরেছিল শাসকদলের নেতাদের একাংশকে। মাফিয়া সিন্ডিকেট ও প্রোমোটাররাজের সঙ্গে যোগ ছিন্ন না করলে দলে, পুরসভায় শুধু পদাধিকারী বদলে তৃণমূলের লাভ কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

এই যোগ ছিন্ন করা কঠিন। জেলায় জেলায় চেয়ে দেখুন, এই যোগ যেন তৃণমূলের নাড়ির সঙ্গে। ছিন্ন হলে দলই বরং অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *